{{ news.section.title }}
আপনার ওপর কোরবানি ওয়াজিব কি না বুঝবেন যেভাবে?
ইসলামের অন্যতম তাৎপর্যমণ্ডিত ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত কোরবানি। এতে আছে আত্মত্যাগ, আনুগত্য, আল্লাহভীতি ও প্রভুপ্রেমের গভীর শিক্ষা। কোরবানির ইতিহাস মানবজাতির সূচনালগ্ন থেকেই পাওয়া যায়। হযরত আদম (আ.)–এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনা থেকে শুরু করে হযরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)–এর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক শিক্ষা কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় সম্পদ উৎসর্গ করার ইবাদত। এ কারণে ইসলামে কোরবানির মূল্য গরিবদের মধ্যে বিতরণ করলেই কোরবানি আদায় হয়ে যায় না। কোরবানি আদায় করতে হলে নির্ধারিত সময়ে আল্লাহর নামে নির্দিষ্ট পশু জবাই করতে হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বান্দার নামাজ, কোরবানি, জীবন ও মৃত্যু সবকিছু আল্লাহর জন্য নিবেদিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াতে “নুসুক” শব্দটি sacrifice বা ইবাদতস্বরূপ কোরবানির অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন,
قُلۡ اِنَّ صَلَاتِیۡ وَ نُسُکِیۡ وَ مَحۡیَایَ وَ مَمَاتِیۡ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ
অর্থ: ‘বলো, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন-মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই নিবেদিত।’ (সুরা আনআম: ১৬২)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় ১০ বছর অবস্থান করেছেন এবং প্রতিবছর কোরবানি দিয়েছেন।’ (আহমদ ও তিরমিজি)
অপর হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে নামাজ আদায় করতে না আসে।’ (ইবনে মাজাহ)
ইবনে মাজাহর এই হাদিসে সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কোরবানির গুরুত্ব অত্যন্ত জোরালোভাবে বোঝানো হয়েছে। হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত অবহেলা করা মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়।
কোরবানি কখন, কার ওপর ওয়াজিব
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষ, যে ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজনে আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
আর নেসাব হলো স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭ দশমিক ৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২ দশমিক ৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হলো- এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব। (আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫)
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, কোরবানির বিধান মূলত ব্যক্তির ওপর বর্তায়, পরিবারের ওপর নয়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজ নামে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, তার ওপর আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব হবে। পরিবারে শুধু একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি থাকলেও যদি অন্য সদস্যদের নিজস্ব স্বর্ণ, সঞ্চয়, ব্যবসায়িক সম্পদ বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ নেসাব পরিমাণ থাকে, তাহলে তাদের ওপরও পৃথক কোরবানি ওয়াজিব হবে। ইসলামী ফিকহভিত্তিক আলোচনাতেও কোরবানির নেসাব ও ব্যক্তিভিত্তিক দায়িত্বের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।
জেনে রাখা উচিত, একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে একাধিক ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পাওয়া গেলে অর্থাৎ তাদের কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা কোরবানি করা ওয়াজিব। পরিবারের যত সদস্যের ওপর কোরবানি ওয়াজিব তাদের প্রত্যেককেই একটি করে পশু কোরবানি করতে হবে কিংবা বড় পশুতে পৃথক পৃথক অংশ দিতে হবে। একটি মাত্র কোরবানি সকলের জন্য যথেষ্ট হবে না।
বড় পশুতে অংশ নেওয়ার বিধান
গরু, মহিষ ও উটের মতো বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাতজন অংশ নিতে পারেন। তবে শর্ত হলো, প্রত্যেক অংশীদারের নিয়ত কোরবানি বা ইবাদতের হতে হবে। কারও উদ্দেশ্য যদি শুধু গোশত নেওয়া হয়, তাহলে অন্য অংশীদারদের কোরবানির শুদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাই অংশীদার নির্বাচন করার সময় দ্বীনদার, সচেতন ও নিয়তের ব্যাপারে সতর্ক মানুষকে সঙ্গে নেওয়া উচিত।
ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা একজনের পক্ষ থেকেই কোরবানি করা যায়। এক ছাগল পুরো পরিবারের পক্ষ থেকে ওয়াজিব কোরবানির জন্য যথেষ্ট নয়, যদি পরিবারের একাধিক সদস্যের ওপর কোরবানি ওয়াজিব থাকে। তবে কেউ নিজের ওয়াজিব কোরবানি আদায়ের পর সওয়াবের নিয়তে পরিবারের সদস্যদের শরিক করে দোয়া করতে পারেন।
পশুর মূল্য দান করলে কোরবানি আদায় হবে কি?
অনেকেই মনে করেন, পশু কোরবানি না করে সেই টাকা গরিবদের দিয়ে দিলে হয়তো বেশি উপকার হবে। গরিবদের দান করা অবশ্যই বড় নেক আমল। তবে কোরবানির নির্ধারিত ইবাদত হলো নির্দিষ্ট সময়ে পশু জবাই করা। তাই কোরবানির টাকা দান করলে দানের সওয়াব পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু ওয়াজিব কোরবানি আদায় হবে না। কারণ কোরবানি একটি স্বতন্ত্র ইবাদত, যার মাধ্যমে আল্লাহর নামে প্রাণী জবাই করে তাকওয়ার প্রকাশ ঘটানো হয়।
পবিত্র কোরআনের শিক্ষাও হলো, আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না; পৌঁছায় বান্দার তাকওয়া। তাই কোরবানি বাহ্যিকভাবে পশু জবাই হলেও এর মূল উদ্দেশ্য অন্তরের আল্লাহভীতি, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের চর্চা।
কোরবানির সময়
কোরবানি করতে হয় ১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করলে তা কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে না; বরং সাধারণ জবাই হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই শহর বা এমন এলাকায় যেখানে ঈদের নামাজ হয়, সেখানে নামাজের পর কোরবানি করা জরুরি। গ্রামাঞ্চলের ফিকহি কিছু আলোচনা ভিন্ন হতে পারে, তবে সাধারণভাবে ঈদের নামাজের পর কোরবানি করাই নিরাপদ ও প্রচলিত নিয়ম।
কোরবানির সামাজিক শিক্ষা
কোরবানি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এটি সমাজে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার মাধ্যমে সমাজে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে যেসব মানুষ সারা বছর ভালো খাবারের সুযোগ কম পান, কোরবানির ঈদ তাদের ঘরেও আনন্দ পৌঁছে দেয়।
তবে কোরবানিকে প্রতিযোগিতা, লোকদেখানো বা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম বানানো উচিত নয়। বড় পশু কেনা, ছবি তোলা বা নিজের সামর্থ্য দেখানো কোরবানির উদ্দেশ্য নয়। কোরবানির আসল শিক্ষা হলো-আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় সম্পদ উৎসর্গ করা।
নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা জরুরি
কোরবানির ক্ষেত্রে নিয়ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পশু সুন্দর, দামি বা বড় হওয়া প্রশংসনীয় হতে পারে, তবে তা গ্রহণযোগ্য হওয়ার মূল শর্ত নয়। আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় সেই আমল, যা ইখলাস ও তাকওয়ার সঙ্গে করা হয়। তাই কোরবানির পশু কেনা থেকে শুরু করে জবাই, গোশত বিতরণ ও আচরণ-সব ক্ষেত্রেই আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সামনে রাখা উচিত।
পরিশেষে বলা যায়, কোরবানি ইসলামের এক মহিমান্বিত ইবাদত, যার মধ্যে রয়েছে তাওহিদ, তাকওয়া, আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও সামাজিক কল্যাণের শিক্ষা। সামর্থ্যবান মুসলমানের উচিত কোরবানির বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা, নিজের ওপর কোরবানি ওয়াজিব কি না তা যাচাই করা এবং শরিয়াহসম্মত পদ্ধতিতে কোরবানি আদায় করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের কোরবানি কবুল করুন এবং হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)–এর আত্মসমর্পণের শিক্ষা নিজের জীবনে ধারণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।