{{ news.section.title }}
গুনাহ করার পরেও আল্লাহ যে ১০ ব্যক্তিকে ভালোবাসেন!
মানুষ মাত্রই ভুল করে। কেউই গুনাহমুক্ত নয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলার অসীম রহমতের সৌন্দর্য এখানেই যে, তিনি শুধু নেককার বান্দাদেরই ভালোবাসেন না; বরং সেই মানুষগুলোকেও ভালোবাসেন, যারা ভুল করার পর অনুতপ্ত হয়ে তার দিকে ফিরে আসে।
কখনো চোখের জল, কখনো গভীর লজ্জা, কখনো নিরব কান্না- একজন গুনাহগার বান্দার তওবা আল্লাহর দরবারে এতটাই প্রিয় যে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য রহমতের দরজা খুলে দেন। তাই গুনাহ করে হতাশ হওয়া নয়; বরং ফিরে আসাটাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
ইসলামে তওবা মানে শুধু মুখে ‘ক্ষমা চাই’ বলা নয়; বরং গুনাহ থেকে ফিরে আসা, অন্তরে অনুতাপ সৃষ্টি হওয়া, সেই পাপ ছেড়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে তা না করার দৃঢ় সংকল্প করা। আলেমদের ব্যাখ্যায়, কারও অধিকার নষ্ট হয়ে থাকলে তার হক ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চাওয়াও তওবার গুরুত্বপূর্ণ শর্তের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারাহ: আয়াত ২২২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন-
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
‘আদম সন্তানের সবাই ভুলকারী, আর ভুলকারীদের মধ্যে উত্তম হলো তারা, যারা বেশি বেশি তওবা করে।’ (তিরমিজি ২৪৯৯)
এই হাদিসে মানুষের দুর্বলতার বাস্তবতা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি আশার দরজাও খুলে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ভুল করলেই মানুষ শেষ হয়ে যায় না; বরং ভুলের পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই তাকে উত্তম বান্দাদের কাতারে নিয়ে যেতে পারে। তিরমিজির বর্ণনায়ও একই অর্থ এসেছে-আদম সন্তানের সবাই ভুল করে, আর ভুলকারীদের মধ্যে উত্তম হলো তওবাকারীরা।
যেসব ভুলকারীকে আল্লাহ ভালোবাসেন
১️. তওবাকারী মানুষ
যে ব্যক্তি নিজের ভুল বুঝে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। তওবা শুধু মুখের কথা নয়; বরং হৃদয়ের কান্না ও জীবন বদলে ফেলার অঙ্গীকার। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩১)
ইসলামী আলেমরা বলেন, তওবার দরজা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খোলা থাকে। তাই কোনো বান্দা যত পাপই করুক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া মুমিনের কাজ নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ নিজেই বলেছেন, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে তারা যেন আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়; নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।
২️. অশ্রুসিক্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়া মানুষ
যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কেঁদে ফেলে, সেই চোখ জাহান্নামের আগুন থেকে নিরাপদ হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন-
عَيْنَانِ لَا تَمَسُّهُمَا النَّارُ: عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ
‘দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না- তার একটি হলো যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে ‘ (তিরমিজি ১৬৩৯)
আল্লাহর ভয়ে কান্না করা অন্তরের জীবন্ত থাকার আলামত। কারণ যে অন্তর আল্লাহকে ভয় করে, সে অন্তর গুনাহের ওপর স্থির থাকতে পারে না। নির্জনে আল্লাহর সামনে চোখের পানি ফেলা অনেক সময় মানুষের জীবন বদলে দেয়।
৩️. গুনাহ করে লজ্জিত হয়ে ফিরে আসা মানুষ
গুনাহের পর হৃদয়ে অনুশোচনা জাগা ইমানের আলামত। যে ব্যক্তি নিজের ভুলে লজ্জিত হয়, তার অন্তর এখনো জীবিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন-
النَّدَمُ تَوْبَةٌ
‘অনুতপ্ত হওয়াই তওবা।’ (ইবনে মাজাহ ৪২৫২)
আলেমদের মতে, অনুতাপ তওবার মূল প্রাণ। কেউ যদি পাপকে পাপই মনে না করে, তাহলে সে তওবার পথে আসে না। কিন্তু যখন গুনাহের পর অন্তরে ব্যথা তৈরি হয়, তখন বুঝতে হবে আল্লাহ তাকে ফিরে আসার সুযোগ দিচ্ছেন।
৪️. গুনাহ করার পর নেক আমল বাড়িয়ে দেয়
একজন মুমিন ভুল করার পর ভালো কাজের মাধ্যমে নিজের আমলনামা ভারী করার চেষ্টা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ
‘নিশ্চয়ই সৎকর্মসমূহ পাপগুলো মিটিয়ে দেয়।’ (সুরা হূদ: আয়াত ১১৪)
তাই ভুল হয়ে গেলে হতাশ হয়ে বসে থাকা উচিত নয়। বরং বেশি বেশি নামাজ, দান-সদকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, ইস্তিগফার এবং মানুষের উপকারের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।
৫️. বারবার গুনাহ করেও তওবায় ফিরে আসে
মানুষ দুর্বল হতে পারে, কিন্তু বারবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসাটাই মুমিনের পরিচয়। এক হাদিসে আল্লাহ তাআলা বলেন-
‘আমার বান্দা গুনাহ করেছে, তারপর জেনেছে তার একজন রব আছেন যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন। তাই আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম।’ (মুসলিম ২৭৫৮)
আলেমরা বলেন, একই গুনাহ বারবার হয়ে গেলেও প্রতিবার যদি বান্দা সত্যিকারের অনুতাপ নিয়ে ফিরে আসে, তাহলে তাকে তওবা থেকে নিরাশ করা যাবে না। তবে শর্ত হলো-সে গুনাহকে হালকা মনে করবে না, বরং প্রতিবার আন্তরিকভাবে ছাড়ার চেষ্টা করবে।
৬️. নফসের সঙ্গে সংগ্রাম করে
নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই সবচেয়ে বড় জিহাদগুলোর একটি। গুনাহের টান থাকা সত্ত্বেও যে নিজেকে সামলায়, সে আল্লাহর কাছে সম্মানিত। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ
‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করেছে এবং নফসকে প্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছে, জান্নাতই হবে তার আবাস।’ (সুরা আন-নাযিআত: আয়াত ৪০–৪১)
নফস মানুষকে বারবার ভুলের দিকে টানে। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, সে ধীরে ধীরে আল্লাহর আনুগত্যের পথে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
৭️. গোপনে গুনাহ করে গোপনে কান্না করে
মানুষের সামনে নয়, নির্জনে আল্লাহর কাছে কান্না করা বান্দা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন-
‘সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ আরশের ছায়া দেবেন… তাদের একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রু ঝরায়।’ (বুখারি ৬৬০)
গোপনে তওবা করা বান্দার ইখলাসের প্রমাণ। কারণ সেখানে মানুষের প্রশংসা নেই, বাহ্যিক প্রদর্শন নেই; আছে শুধু রবের সামনে ভাঙা হৃদয়ের আত্মসমর্পণ।
৮️. নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ করে
গুনাহ মানুষকে ভেঙে দেয়, আর সেই ভাঙা হৃদয় থেকেই জন্ম নেয় বিনয়। আল্লাহ অহংকারীকে পছন্দ করেন না, কিন্তু বিনয়ী বান্দাকে ভালোবাসেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْتَكْبِرِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আন-নাহল: আয়াত ২৩)
গুনাহের পর যে ব্যক্তি নিজেকে বড় মনে করে না, অন্যকে ছোট করে না এবং আল্লাহর সামনে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে, তার জন্য তওবার দরজা আরও সহজ হয়ে যায়।
৯️. গুনাহ করে কিন্তু অন্যকে উপদেশ দেয়
নিজে ভুল করলেও ভালো কথা বলা বন্ধ করা উচিত নয়। কারণ মানুষকে ভালো পথে ডাকাও একটি নেক আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ
‘তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ার ব্যাপারে একে অপরকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা আল-মায়িদাহ: আয়াত ২)
তবে এ ক্ষেত্রে নিজের সংশোধনের চেষ্টাও জরুরি। মানুষকে নসিহত করা যেমন নেক কাজ, তেমনি নিজের জীবনে সেই নসিহত বাস্তবায়নের চেষ্টা করাও মুমিনের দায়িত্ব।
১০. গুনাহের পথ ছেড়ে দেয়
সবচেয়ে সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে একসময় গুনাহে ডুবে ছিল, কিন্তু একদিন আল্লাহর জন্য সেই পথ চিরতরে ছেড়ে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ
‘তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে- আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে নেকিতে পরিবর্তন করে দেন ‘ (সুরা আল-ফুরকান: আয়াত ৭০)
এ আয়াত মুমিনের জন্য বিরাট আশার বার্তা। আল্লাহ শুধু ক্ষমা করেন না; তিনি চাইলে বান্দার অতীত পাপগুলোও নেকিতে পরিবর্তন করে দিতে পারেন। তাই তওবার পথ কখনো ছোট নয়, বরং এটি আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর দরজা।
তওবার জন্য যা জরুরি
ইসলামী আলেমদের ব্যাখ্যায় খাঁটি তওবার কয়েকটি শর্ত রয়েছে-গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, অতীত ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, ভবিষ্যতে তা না করার দৃঢ় ইচ্ছা করা এবং যদি কোনো মানুষের হক নষ্ট হয়ে থাকে তবে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চাওয়া।
গুনাহ মানুষকে ধ্বংস করে না; বরং গুনাহের পর আল্লাহর দিকে ফিরে না আসাটাই মানুষকে ধ্বংস করে। আল্লাহর দরজা সবসময় খোলা। যত বড় পাপই হোক, আন্তরিক তওবা একজন মানুষকে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত করতে পারে। তাই হতাশ নয়, ফিরে আসুন রবের কাছে। হয়তো আপনার একটি অশ্রুবিন্দুই বদলে দিতে পারে আপনার পুরো জীবন।
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনুন, তওবার স্বাদ দান করুন এবং আপনার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।