{{ news.section.title }}
ভাগে কোরবানি: নিয়ত, অংশীদার ও বণ্টনের জরুরি বিধান
কোরবানি ইসলামের একটি মহান নিদর্শন ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সামর্থ্য থাকলে এককভাবে একটি পশু কোরবানি করা উত্তম। তবে বড় পশুর ক্ষেত্রে শরিয়াহ অংশীদারত্বের সুযোগ দিয়েছে। গরু, মহিষ ও উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন মিলে কোরবানি করা বৈধ।
কিন্তু এই অংশীদারি কোরবানি যেন শুধু মাংস ভাগাভাগির সামাজিক আয়োজন না হয়ে যায়, সেজন্য ইসলামি ফিকহে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে।
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘গাভি ও উট সাত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি করা যাবে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২৭৯৯)।
সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, হুদাইবিয়ার বছর সাহাবিরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরু সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করেছিলেন। সহিহ মুসলিম ও সুনানে আবু দাউদে এ অর্থের বর্ণনা পাওয়া যায়।
ইসলামি স্কলারদের মতে, বড় পশুতে সাত ভাগের কম অংশীদার হওয়াও বৈধ। যেমন তিনজন, চারজন বা পাঁচজন মিলে গরু কোরবানি করতে পারেন। তবে সাত ভাগের বেশি করা যাবে না। একজন চাইলে একাধিক ভাগও নিতে পারেন। কিন্তু প্রতিটি ভাগ যেন শরিয়তসম্মত উদ্দেশ্যে হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হানাফি ফিকহভিত্তিক আলোচনায়ও বলা হয়েছে, গরু ও উটে সর্বোচ্চ সাত ভাগ করা যায়; ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা একজনের পক্ষ থেকেই কোরবানি হবে।
১. নিয়ত হতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য
অংশীদারি কোরবানির প্রধান শর্ত হলো-অংশ নেওয়া প্রত্যেকের নিয়ত বা উদ্দেশ্য হতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। কোরবানি ইবাদত; তাই এতে লোকদেখানো, সামাজিক প্রতিযোগিতা, শুধু মাংস পাওয়ার উদ্দেশ্য বা অন্য কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ রাখা যাবে না।
যদি সাতজনের মধ্যে একজনেরও উদ্দেশ্য শুধু মাংস খাওয়া হয় কিংবা কোনো অমুসলিম এতে শরিক হয়, তবে অন্যদের কোরবানিও সহিহ্ হবে না। কারণ বড় পশুতে প্রত্যেক অংশীদারের অংশ আলাদা হলেও পশুটি একসঙ্গে আল্লাহর নামে জবাই হয়। তাই একজনের নিয়তের ত্রুটি পুরো অংশীদারি কোরবানির শুদ্ধতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
হানাফি ফিকহের সূত্রগুলোতে বলা হয়েছে, বড় পশুতে শরিকদের সবার নিয়ত কোরবানি, আকিকা বা এ ধরনের নেক উদ্দেশ্যের হতে হবে। যদি কোনো অংশীদারের উদ্দেশ্য শুধু মাংস নেওয়া হয়, তাহলে কারও কোরবানি গ্রহণযোগ্য হবে না-এমন ব্যাখ্যা আল-মুহীত আল-বুরহানী থেকে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি-একই পশুতে কারও ওয়াজিব কোরবানি, কারও নফল কোরবানি, কারও আকিকা-এ ধরনের নেক নিয়ত একসঙ্গে থাকতে পারে। তবে সবার উদ্দেশ্য ইবাদত হওয়া চাই। শুধু মাংস ভাগ করে নেওয়া বা বাজারদরের তুলনায় সস্তায় গোশত পাওয়া কোরবানির নিয়ত হতে পারে না।
২. অংশীদার মারা গেলে করণীয়
কয়েকজন মিলে পশু কেনার পর যদি কোনো একজন অংশীদার মারা যান, তাহলে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে সমাধান করতে হয়। মৃত ব্যক্তির অংশ তার ওয়ারিশদের অধিকারভুক্ত হয়ে যায়। তাই তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক উত্তরাধিকারীদের অনুমতি নিয়ে তাঁর পক্ষে কোরবানি করা যাবে।
কিন্তু যদি ওয়ারিশরা অনুমতি না দেন, তবে মৃত ব্যক্তির ভাগে কোরবানি করা যাবে না। এমন ক্ষেত্রে সেই অংশটি মৃতের সম্পত্তির অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। শরিয়াহর দৃষ্টিতে কারও সম্পদ তার অনুমতি ছাড়া ইবাদতের কাজে ব্যয় করা যায় না-বিশেষ করে যখন তা ওয়ারিশদের অধিকারে চলে যায়।
তাই যৌথ কোরবানিতে অংশীদার মারা গেলে তাড়াহুড়ো করে পশু জবাই না করে আগে তার ওয়ারিশদের সঙ্গে কথা বলা জরুরি। যদি সব প্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশ অনুমতি দেন, তাহলে তার পক্ষ থেকে কোরবানি করা যাবে। যদি নাবালক ওয়ারিশ থাকে, তাহলে তাদের সম্পদ থেকে কোরবানি করা নিয়ে আরও সতর্কতা প্রয়োজন; কারণ নাবালকের সম্পদ তার স্বার্থ ছাড়া ব্যয় করা বৈধ নয়।
৩. পশু কেনার পর শরিক নেওয়া যাবে কি?
যৌথ উদ্যোগে কোরবানি করতে চাইলে পশু কেনার আগেই অংশীদার নির্দিষ্ট করে নেওয়া উত্তম। এতে নিয়ত পরিষ্কার থাকে, অর্থের হিসাব ঠিক থাকে এবং পরে কোনো বিরোধের আশঙ্কা কমে যায়। তবে কেউ একা কোরবানি করবেন ভেবে বড় পশু কিনেছেন, পরে কাউকে শরিক করতে চান-এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির আর্থিক অবস্থার ওপর বিধান ভিন্ন হতে পারে।
যদি কোনো সামর্থ্যবান ব্যক্তি একা কোরবানি করার নিয়তে গরু বা উট কিনে পরে অন্য কাউকে শরিক করতে চান, তাহলে তা করা যাবে। তবে পশু কেনার সময়ই ভাগে কোরবানির নিয়ত থাকা উত্তম। এতে কোরবানির উদ্দেশ্য ও মালিকানা নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা থাকে না।
অন্যদিকে যে ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, এমন কোনো দরিদ্র ব্যক্তি যদি কোরবানির উদ্দেশ্যে পশু কিনে ফেলেন, তাহলে পশুটি আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়। তার জন্য পরে অন্য কাউকে শরিক হিসেবে নেওয়া জায়েজ নয়। কারণ তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব না থাকলেও তিনি যখন নির্দিষ্ট পশু কোরবানির নিয়তে কিনলেন, তখন সেই পশুর সঙ্গে তার নফল ইবাদতের অঙ্গীকার যুক্ত হয়ে গেল। এ ধরনের ফিকহি পার্থক্য সাধারণ মানুষের কাছে অনেক সময় অস্পষ্ট থাকে। তাই আলেমরা বলেন, ভাগে কোরবানি করতে হলে আগেই শরিক, ভাগ, টাকা, দায়িত্ব ও মাংস বণ্টনের পদ্ধতি পরিষ্কার করা উচিত।
৪. মাংস বণ্টন করতে হবে সঠিকভাবে
যৌথ কোরবানির ক্ষেত্রে মাংস বণ্টন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ভাগ করা উচিত নয়। কারণ এতে কারও অংশ কম বা বেশি হয়ে যেতে পারে, যা অন্যের হক নষ্ট করার শামিল। তাই বড় পশুতে যারা শরিক হবেন, তাদের মাংস যথাসম্ভব ওজন করে সমানভাবে বণ্টন করতে হবে।
হানাফি ফিকহভিত্তিক একাধিক ফতোয়ায় বলা হয়েছে, যৌথ কোরবানির পশুর মাংস ওজন করে ভাগ করা জরুরি; শুধু অনুমান করে ভাগ করা বৈধ নয়। তবে যদি প্রত্যেক ভাগে মাংসের সঙ্গে মাথা, পা, চামড়া বা অন্য অংশ এমনভাবে দেওয়া হয়, যাতে লেনদেনটি মাংসের সরাসরি ওজনভিত্তিক বিনিময়ের মতো না থাকে, তখন কিছু ফিকহি ছাড়ের আলোচনা আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ পদ্ধতি হলো-মাংস ওজন করে ভাগ করা।
বিশেষ করে যদি ওই পশুতে মানত, অসিয়ত বা ওয়াজিব কোরবানির অংশ থাকে, তাহলে আরও বেশি সতর্কতা দরকার। কারণ মানত বা অসিয়তের মাংস অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে দরিদ্রদের দিতে হয়। এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৫. সাত ভাগ মানে সাতজনই হতে হবে-এ ধারণা ঠিক নয়
অনেকের ধারণা, গরু বা উটে কোরবানি দিলে অবশ্যই সাতজন শরিক হতে হবে। এটি সঠিক নয়। বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাত ভাগ করা যায়; তবে সাতজন হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। একজন একাই পুরো গরু কোরবানি করতে পারেন, দুইজনও করতে পারেন, আবার তিন বা পাঁচজনও শরিক হতে পারেন। শুধু শর্ত হলো, মোট ভাগ সাতের বেশি হবে না এবং প্রত্যেকের নিয়ত ইবাদত হতে হবে।
ইসলামী সূত্রগুলোতেও বলা হয়েছে, বড় পশুতে এক থেকে সাতজন পর্যন্ত অংশ নিতে পারেন। কোনো ব্যক্তি একাধিক ভাগও নিতে পারেন। যেমন একজন দুই ভাগ, আরেকজন তিন ভাগ, অন্যজন দুই ভাগ-এভাবে সাত ভাগ পূর্ণ করা যায়।
৬. ছাগল বা ভেড়ায় ভাগ হয় না
গরু, মহিষ ও উটের মতো বড় পশুতে সাত ভাগের সুযোগ থাকলেও ছাগল, ভেড়া বা দুম্বায় ভাগ করা যায় না। এগুলো একজনের পক্ষ থেকেই কোরবানি হবে। কোনো পরিবারে একাধিক ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব হলে একটি ছাগল সবার ওয়াজিব কোরবানির জন্য যথেষ্ট হবে না।
তবে একজন ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে কোরবানি করে তার পরিবারের সদস্যদের সওয়াবে শরিক করার দোয়া করতে পারেন। এটি আলাদা বিষয়। কিন্তু ওয়াজিব কোরবানির হিসাব ব্যক্তিভিত্তিক হলে প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য আলাদা অংশ বা আলাদা পশু প্রয়োজন।
৭. অংশীদারদের টাকা ও দায়িত্ব আগে ঠিক করা উচিত
যৌথ কোরবানির বড় সমস্যা হয় অর্থের হিসাব নিয়ে। কেউ আগে টাকা দেয়, কেউ পরে দেয়; কেউ পশু কেনে, কেউ জবাইয়ের খরচ দেয়; কেউ মাংস বেশি চায়-এসব থেকে বিরোধ তৈরি হতে পারে। তাই পশু কেনার আগেই কয়েকটি বিষয় লিখিত বা স্পষ্টভাবে ঠিক করা ভালো।
প্রথমত, কার নামে কয় ভাগ কোরবানি হবে। দ্বিতীয়ত, পশুর দাম, পরিবহন, রাখাল, খাদ্য, জবাই, কসাই ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার খরচ কীভাবে ভাগ হবে। তৃতীয়ত, মাংস কতভাবে ভাগ হবে এবং দরিদ্রদের জন্য কত অংশ রাখা হবে। চতুর্থত, কার অংশ ওয়াজিব, কার অংশ নফল, কার অংশ আকিকা বা মানত-এসব পরিষ্কার থাকতে হবে।
৮. কোরবানির মাংস কীভাবে বিতরণ করবেন
কোরবানির মাংস নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা সুন্নাহসম্মত ও উত্তম। প্রচলিতভাবে তিন ভাগ করা হয়-এক ভাগ নিজের পরিবার, এক ভাগ আত্মীয়-প্রতিবেশী, এক ভাগ দরিদ্রদের জন্য। তবে এটি কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক ভাগ নয়; পরিস্থিতি অনুযায়ী কমবেশি করা যায়।
ইসলামিক রিলিফ ও অন্যান্য দাতব্য সংস্থার কোরবানি নির্দেশিকায়ও মাংস দরিদ্র ও অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে যৌথ পশুর ক্ষেত্রে প্রথমে শরিকদের অংশ সঠিকভাবে বণ্টন করতে হবে; এরপর প্রত্যেকে নিজের অংশ থেকে দান করবেন, অথবা সবাই আগে থেকেই সম্মত হলে পুরো মাংস একসঙ্গে দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করতে পারেন।
৯. অংশীদার নির্বাচনেও সতর্কতা দরকার
যেহেতু একজন অংশীদারের নিয়তের ত্রুটি অন্যদের কোরবানির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তাই শরিক বেছে নেওয়ার সময় সতর্ক থাকা জরুরি। যারা কোরবানিকে শুধু মাংস সংগ্রহের উপায় মনে করেন, কোরবানির বিধান মানতে চান না, অথবা ইবাদতের নিয়ত স্পষ্ট নয়-তাদের সঙ্গে শরিক হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। ভালো হয়, যারা নামাজি, শরিয়াহ সম্পর্কে সচেতন, কোরবানির উদ্দেশ্য বোঝেন এবং মাংস বণ্টনে সৎ-তাদের সঙ্গে অংশীদারি করা। এতে কোরবানির ইবাদত যেমন শুদ্ধ হওয়ার আশা থাকে, তেমনি সামাজিক বিরোধও কমে।
১০. কোরবানির আসল শিক্ষা ভুলে গেলে চলবে না
কোরবানির মূল উদ্দেশ্য মাংস নয়; আল্লাহর সন্তুষ্টি। পশু বড় না ছোট, দাম বেশি না কম-এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়ত, তাকওয়া ও শরিয়াহসম্মত পদ্ধতি। অংশীদারি কোরবানির বিধান মানুষের জন্য সহজতা। কিন্তু এই সহজতা যেন অবহেলা, অসততা বা শুধু মাংস ভাগাভাগির মাধ্যমে ইবাদতের রুহ নষ্ট না করে।
সুতরাং ভাগে কোরবানি দিতে হলে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে-বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাত ভাগ, প্রত্যেক অংশীদারের নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টি, মৃত অংশীদারের ক্ষেত্রে ওয়ারিশদের অনুমতি, দরিদ্র ব্যক্তির পশু কেনার পর শরিক না নেওয়া, এবং মাংস ওজন করে সঠিকভাবে ভাগ করা।