{{ news.section.title }}
নবীজি (সা.) যেভাবে কোরবানি করতেন
কোরবান আরবি শব্দ। আভিধানিক অর্থ কাছে যাওয়া বা নৈকট্য অর্জন করা। ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় কোরবানি হলো নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট পশু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে জবাই করা। এটি শুধু পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, আত্মত্যাগ, তাকওয়া ও প্রভুপ্রেমের এক মহান ইবাদত।
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, জ্ঞানসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ১০ জিলহজ সকাল থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নিসাব পরিমাণ সম্পদ অর্থাৎ সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা এর যেকোনো একটির মূল্যের সমপরিমাণ নগদ অর্থ বা ব্যবসার পণ্যের মালিক থাকেন-তার জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব হবে। হানাফি ফিকহভিত্তিক আলোচনায়ও বলা হয়েছে, যে প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক এবং মুসাফির নন, তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব; পরিবারের একাধিক ব্যক্তি নেসাবের মালিক হলে প্রত্যেকের পক্ষ থেকে আলাদা কোরবানি আবশ্যক হবে।
নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করার পর কোরবানির বিধান অবতীর্ণ হয়। তিনি প্রতিবছর কোরবানি করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার ১০ বছর জীবনের প্রতিবছরই কোরবানি করেছেন। (তিরমিজি: ১৫০৭)
নবীজি (সা.)-এর কোরবানি
কোরবানি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ইবাদত। প্রথম মানব ও নবী আদম (আ.)-এর যুগেই যার প্রচলন ঘটেছিল। পরবর্তীতে হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর আত্মসমর্পণের ঘটনা কোরবানির মূল চেতনাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। এ ইবাদতের মাধ্যমে মুমিন ঘোষণা করে-তার সম্পদ, ইচ্ছা, ভালোবাসা ও জীবন সবই আল্লাহর নির্দেশের সামনে সমর্পিত।
বিশুদ্ধ মতে, মদিনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছর মুসলিম উম্মাহর ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার পর নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও কোরবানির আমল ত্যাগ করেননি।
ইসলামি স্কলারদের মতে, কোরবানির মূল শিক্ষা হলো তাকওয়া। পশুর গোশত বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না; বরং বান্দার নিয়ত, ইখলাস ও আল্লাহভীতি আল্লাহর কাছে মূল্যবান। তাই কোরবানি করার সময় লোকদেখানো, প্রতিযোগিতা বা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মনোভাব থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।
নবীজির কোরবানির পশু যেমন ছিল
নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির জন্য দৃষ্টিনন্দন পশু নির্বাচন করতেন, যা সব বিচারেই উত্তম ছিল। পশু যেন সুস্থ, সবল, পরিপুষ্ট ও দোষমুক্ত হয়-এ বিষয়টি ইসলামে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ইসলামি বিধান অনুযায়ী কোরবানির পশু নির্দিষ্ট শ্রেণির গৃহপালিত প্রাণী হতে হবে, শরিয়ত নির্ধারিত বয়সে পৌঁছাতে হবে এবং এমন কোনো বড় ত্রুটি থাকা যাবে না, যা কোরবানির উপযুক্ততা নষ্ট করে দেয়।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির ইচ্ছা করলে দুটি মোটাতাজা, মাংসল, শিংযুক্ত, ধুসর বর্ণের ও খাসি করা মেষ ক্রয় করতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২২)
নবীজি যেসব পশু দ্বারা কোরবানি করেছেন
নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক পশু দ্বারা কোরবানি করেছেন। হাদিসে যেসব পশুর বর্ণনা পাওয়া যায় তা হলো-
১. গরু: হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় স্ত্রীগণের পক্ষ থেকে গাভি দ্বারা কোরবানি করেছেন। (বুখারি: ২৯৪)
২. মেষ বা ভেড়া: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির ইচ্ছা করলে দুটি মোটাতাজা, মাংসল, শিংযুক্ত, ধূসর বর্ণের ও খাসি করা মেষ ক্রয় করতেন। (ইবনে মাজাহ: ৩১২২)
৩. দুম্বা : আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে দুম্বা কোরবানি করেন। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ২৭৯২)
৪. উট: বিদায় হজে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায়ের জন্য ১০০টি উট কোরবানি করেন। যার ৬৩টি তিনি নিজে জবাই করেন আর বাকিগুলো হযরত আলী (রা.) জবাই করেন। (ত্বহাবি: ৬২৩৬)
৫. ছাগল: নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাগল দ্বারা তার নাতি হাসানের আকিকা করেছেন এবং সাহাবিদের ছাগল দ্বারা কোরবানি করার অনুমতি দিয়েছেন। এ ছাড়া ফকিহ আলেমরা গরু প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত এবং গৃহপালিত হওয়ায় মহিষ দ্বারা কোরবানি করা বৈধ বলেছেন।
ইসলামি ফিকহের আলোচনায় কোরবানির জন্য উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা বৈধ পশু হিসেবে বিবেচিত। বড় পশু-যেমন গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন। তবে অংশীদারদের সবার নিয়ত ইবাদত হওয়া জরুরি। আর ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা একজনের পক্ষ থেকেই কোরবানি করা যায়।
নবীজি নিজ হাতে কোরবানি করতেন
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদগাহে (কোরবানির পশু) জবাই করতেন ও (উট হলে) নহর করতেন।’ (বুখারি: ৫৫৫২)
আলেমরা বলেন, সামর্থ্য ও দক্ষতা থাকলে নিজের কোরবানি নিজ হাতে করা উত্তম। তবে কেউ নিজে জবাই করতে না পারলে অন্যকে দিয়ে করাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোরবানি দাতার উপস্থিত থাকা এবং আল্লাহর নামে কোরবানি সম্পন্ন হওয়া প্রত্যক্ষ করা উত্তম আমল।
নবীজি যেভাবে কোরবানি করতেন
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, ‘নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আয়েশা, ছুরি দাও। এরপর বললেন, এটা পাথরে ঘষে ধারালো কর। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি এটা করলাম। তিনি ছুরি নেন, দুম্বাকে ধরে কাত করে শোয়ান এবং জবাই করার সময় বলেন, ‘বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ, আপনি এ কোরবানি মুহাম্মদ, মুহাম্মদের পরিবার ও তার উম্মতের পক্ষ হতে কবুল করুন।’ অতঃপর তিনি দুম্বাটি কোরবানি করলেন। (আবি দাউদ: ২৭৯২)
এই হাদিস থেকে কোরবানির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আদব জানা যায়। পশুকে কষ্ট না দেওয়া, ছুরি ধারালো করা, আল্লাহর নামে জবাই করা এবং কোরবানিকে ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করার নিয়ত করা-এসব বিষয় নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল থেকে স্পষ্ট হয়। সুনানে আবি দাউদের বর্ণনাতেও কোরবানির আগে ছুরি ধারালো করার নির্দেশ এবং আল্লাহর নামে জবাই করার বিষয়টি এসেছে।
নবীজি কোরবানির গোশত খেতেন
নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোরবানি থেকে নিজেও খেতেন, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও অসহায় মানুষকে খাওয়াতেন। আর তিনি উম্মতকেও তার নির্দেশ দিয়েছেন। (আউনুল মাবুদ: ৭/৩৪৫)
কোরবানির গোশত নিজে খাওয়া বৈধ ও সুন্নাহসম্মত। এটি ইবাদতের অংশ হিসেবে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত থেকে উপভোগ করা। তবে কোরবানির গোশত শুধু নিজের জন্য জমিয়ে রাখা ইসলামের সামাজিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দরিদ্র, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও অভাবী মানুষের হক আদায় করাই কোরবানির সৌন্দর্য।
নবীজির কোরবানির গোশত বিতরণ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরিবারকে কোরবানির এক-তৃতীয়াংশ আহার করাতেন, প্রতিবেশীদের এক-তৃতীয়াংশ আহার করাতেন আর ভিক্ষুকদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ সদকা করতেন। (আল-মুগনি : ৯/৪৪৯)
আলেমদের মতে, কোরবানির গোশত তিন ভাগ করা-নিজের পরিবার, আত্মীয়-প্রতিবেশী এবং দরিদ্রদের জন্য-একটি সুন্দর ও প্রচলিত পদ্ধতি। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে দরিদ্রদের বেশি দেওয়া বা পুরো গোশত দান করাও বৈধ হতে পারে। আন্তর্জাতিক ইসলামী দাতব্য সংস্থাগুলোর কোরবানি নির্দেশিকাতেও দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কাছে কোরবানির গোশত পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
কোরবানির সময় ও সতর্কতা
কোরবানি আদায়ের সময় শুরু হয় ঈদুল আজহার নামাজের পর। ১০, ১১ ও ১২ জিলহজের মধ্যে কোরবানি করা যায়। নির্ধারিত সময়ের আগে পশু জবাই করলে তা সাধারণ জবাই হিসেবে গণ্য হবে, কোরবানি হিসেবে নয়। তাই কোরবানি করার আগে সময়, নিয়ত, পশুর শর্ত এবং জবাইয়ের শরিয়াহসম্মত পদ্ধতি ভালোভাবে জেনে নেওয়া জরুরি।
কোরবানির পশু কেনার সময় শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, পশুর স্বাস্থ্য, বয়স, দোষত্রুটি, মালিকানা ও বৈধ ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। অসুস্থ, অন্ধ, খোঁড়া, অত্যন্ত দুর্বল বা শরিয়ত অনুযায়ী বড় ত্রুটিযুক্ত পশু কোরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
পরিশেষে বলা যায়, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোরবানির আমল মুসলিম উম্মাহর জন্য পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। তিনি উত্তম পশু নির্বাচন করেছেন, নিজ হাতে কোরবানি করেছেন, আল্লাহর নামে দোয়া করে জবাই করেছেন, নিজে খেয়েছেন এবং পরিবার, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করেছেন। তাই কোরবানি যেন শুধু সামাজিক উৎসব বা মাংস সংগ্রহের উপলক্ষ না হয়ে যায়; বরং এটি হোক আল্লাহর নৈকট্য অর্জন, তাকওয়া বৃদ্ধি ও মানবিক সহমর্মিতার বাস্তব প্রকাশ।