{{ news.section.title }}
মহিষ দিয়ে কোরবানি করা যাবে?
কোরবানি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ইবাদত। প্রথম মানব ও নবী আদম (আ.)-এর যুগেই যার প্রচলন ঘটেছিল। বিশুদ্ধ মতে, মদিনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছর মুসলিম উম্মাহর ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার পর নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও কোরবানির আমল ত্যাগ করেননি।
ইসলামি গবেষকদের মতে, কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগ, তাকওয়া ও আনুগত্যের প্রতীক। প্রতি বছর ঈদুল আজহায় মুসলমানরা হজরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর মহান আত্মত্যাগের স্মৃতি অনুসরণ করে কোরবানি আদায় করেন।
অনেকে জানতে চান, মহিষ দিয়ে কোরবানি দিলে কি আদায় হবে?
এর উত্তরে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, সুরা হজের ৩৪ ও ৩৬ নং আয়াতে যে দুটো শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে তা দিয়ে উট, গরু বা গরু জাতীয় পশুকে বোঝায়। আর মহিষ ও গরু যে একই জাতীয় পশু এ ব্যাপারে সবাই একমত।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِّيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ
‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির বিধান নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেওয়া চতুষ্পদ জন্তুর ওপর তাঁর নাম উচ্চারণ করে।’ (সুরা হজ: ৩৪)
আরও এসেছে-
وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُم مِّن شَعَائِرِ اللَّهِ
‘আর কোরবানির উটকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি।’ (সুরা হজ: ৩৬)
তাফসিরবিদদের মতে, ‘বাহিমাতুল আনআম’ বলতে সাধারণভাবে গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু বোঝানো হয়েছে, যার মধ্যে গরু জাতীয় প্রাণীও অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু মহিষ গরু শ্রেণিভুক্ত প্রাণী, তাই কোরবানিতে মহিষ বৈধ।
হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলেন, মহিষ গরুর স্থলাভিষিক্ত। (মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা ৭/৬৫ হা/১০৮৪৮; মির‘আত ৫/৮১ ‘কোরবানি’ অনুচ্ছেদ)।
অতএব মহিষ কোরবানি দেয়াতে কোনো দোষ নেই (মাজমুউল ফাতাওয়া ওছায়মীন ২৫/৩৪, ‘কোরবানি অধ্যায়)।
ইসলামি আইনজ্ঞরা বলেন, মহিষ যেহেতু গরুর হুকুমের অন্তর্ভুক্ত, তাই গরুর মতো এটিতেও সাতজন পর্যন্ত শরিক হয়ে কোরবানি করা যাবে। বয়সের ক্ষেত্রেও গরুর মতো একই বিধান প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ কমপক্ষে দুই বছর পূর্ণ হতে হবে।
মহিষ দিয়ে কোরবানি কেন জনপ্রিয় হচ্ছে?
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে হাওরাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল ও চর এলাকায় মহিষ পালন তুলনামূলক বেশি হয়। ইসলামি স্কলার ও পশু বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় আকার ও অধিক মাংসের কারণে অনেক পরিবার এখন মহিষ কোরবানির দিকে ঝুঁকছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সুস্থ ও বড় মহিষে সাধারণ গরুর তুলনায় বেশি মাংস পাওয়া যায়। ফলে শরিকি কোরবানির ক্ষেত্রে এটি অনেক সময় অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হয়।
কোরবানির পশু নির্বাচনে যেসব বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে
ইসলামে কোরবানির পশু শুধু বৈধ হলেই হবে না, সেটি সুস্থ ও ত্রুটিমুক্তও হতে হবে। হাদিসে এসেছে-
أَرْبَعٌ لَا تَجُوزُ فِي الْأَضَاحِيِّ: الْعَوْرَاءُ الْبَيِّنُ عَوَرُهَا وَالْمَرِيضَةُ الْبَيِّنُ مَرَضُهَا وَالْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ ظَلَعُهَا وَالْكَسِيرَةُ الَّتِي لَا تُنْقِي
‘চার ধরনের পশু কোরবানির জন্য বৈধ নয়- স্পষ্ট কানা, স্পষ্ট অসুস্থ, স্পষ্ট খোঁড়া এবং এমন দুর্বল পশু যার হাড়ে মজ্জা নেই।’ (আবু দাউদ)
ফিকহবিদদের মতে, মহিষ হোক বা গরু- কোরবানির পশু কেনার সময় পশুর বয়স, স্বাস্থ্য, দাঁত ও শারীরিক ত্রুটি ভালোভাবে পরীক্ষা করা উচিত।
কোরবানির আসল উদ্দেশ্য কী?
ইসলামি গবেষকদের মতে, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য কেবল মাংস খাওয়া নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ
‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ: ৩৭)
স্কলাররা বলেন, তাই কোরবানিতে বাহ্যিক জাঁকজমকের চেয়ে নিয়ত, তাকওয়া ও আন্তরিকতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কোরবানির গোশত বণ্টনেও রয়েছে গুরুত্ব
ইসলামি শিক্ষায় কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিবদের মধ্যে বণ্টনের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এতে সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোরবানি এমন একটি ইবাদত যার মাধ্যমে ধনী-গরিব সবাই আনন্দ ভাগাভাগি করার সুযোগ পায়।