কোরবানির মাংস কি ৩ দিনের বেশি রাখা যাবে? যা বলছে ইসলাম

কোরবানির মাংস কি ৩ দিনের বেশি রাখা যাবে? যা বলছে ইসলাম
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

কোরবানি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান শিক্ষা। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর অনন্য ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই মুসলমানরা প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানি আদায় করেন। নবী মুহাম্মদ (সা.) হিজরতের পর থেকে প্রতি বছর কোরবানি করেছেন বলেও হাদিসে বর্ণনা রয়েছে।

ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন এবং মুকিম (স্থায়ীভাবে বসবাসকারী) এমন প্রত্যেক মুসলমান নারী-পুরুষ, যার কাছে ১০ জিলহজ সুবহে সাদিক থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।

 

নেসাবের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে স্বর্ণ, রুপা বা সমমূল্যের সম্পদের ভিত্তিতে। স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত ভরি, রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন ভরি অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা সম্পদ থাকলে কোরবানি ওয়াজিব হবে।

 

প্রতি বছর ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে কোরবানির মাংস সংরক্ষণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা জায়েজ নয়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যও ছড়িয়ে পড়ে। তবে ইসলামি শরিয়াহ ও সহিহ হাদিস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা বৈধ।

 

ইসলামি গবেষক ও আলেমরা বলছেন, মদিনার প্রথম যুগে খাদ্যসংকট ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি থাকায় রাসুলুল্লাহ (সা.) সাময়িকভাবে সাহাবায়ে কেরামকে তিন দিনের বেশি কোরবানির মাংস জমিয়ে রাখতে নিষেধ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল যাতে বেশি সংখ্যক অভাবী মানুষ কোরবানির মাংস পায় এবং কেউ বঞ্চিত না থাকে। পরে যখন পরিস্থিতির উন্নতি হয় এবং অভাব কমে যায়, তখন রাসুল (সা.) নিজেই সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং মাংস খাওয়া, সংরক্ষণ করা ও অন্যদের মধ্যে বিতরণের অনুমতি দেন।

 

ফিলিস্তিনের আল-কুদস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি ফিকহের অধ্যাপক হুসাম আল-দিন ইবনে মুসা আফানা বলেছেন, অধিকাংশ আলেমের মতে কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি সময় ধরে সংরক্ষণ করা সম্পূর্ণ বৈধ। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরবর্তী নির্দেশনার ভিত্তিতেই এ মত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে আয়েশা (রা.) বলেন, ঈদুল আজহার সময় কিছু দরিদ্র মানুষ শহরে এসেছিল। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘তোমরা তিন দিনের প্রয়োজনীয় মাংস রেখে বাকিটা দান করে দাও।’ পরে সাহাবিরা কোরবানির পশুর চর্বি ও চামড়া সংরক্ষণের বিষয় উল্লেখ করলে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি সেই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলাম কারণ তখন অভাব ছিল। এখন তোমরা খেতে পারো, সংরক্ষণ করতে পারো এবং দানও করতে পারো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৭১)

 

আরেকটি হাদিসে সালামা ইবনে আল-আকওয়া (রা.) বর্ণনা করেন, এক বছর রাসুল (সা.) কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি না রাখতে বলেছিলেন। পরের বছর সাহাবিরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেই বছর মানুষের কষ্ট ছিল, তাই আমি চেয়েছিলাম তোমরা অভাবীদের সাহায্য করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৬৯)

 

একইভাবে আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) পরে মুসলমানদের কোরবানির মাংস খাওয়া, অন্যদের খাওয়ানো এবং সংরক্ষণ করার অনুমতি দেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৭২)

 

হানাফি, শাফিঈ, মালিকি ও হানবালি মাজহাবের অধিকাংশ আলেম এ বিষয়ে একমত যে, কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা জায়েজ। আধুনিক সময়ে ফ্রিজ ও ফ্রিজারের মতো প্রযুক্তির কারণে দীর্ঘদিন নিরাপদে মাংস সংরক্ষণ করা সম্ভব হওয়ায় এ বিষয়ে শরিয়াহর কোনো বাধা নেই বলেও মত দিয়েছেন তারা।

 

তবে আলেমরা কোরবানির মাংস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, মাংস সংরক্ষণের উদ্দেশ্য হতে হবে পরিবারের প্রয়োজন পূরণ করা বা পরবর্তীতে অভাবীদের মধ্যে বিতরণ করা। শুধুমাত্র অপচয় বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত মাংস জমিয়ে রাখা ইসলাম সমর্থন করে না। এ ছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাংস পরিষ্কার করে যথাযথ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে মাংস নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যা অপচয়ের শামিল।

 

ইসলামে কোরবানির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সমাজে সহমর্মিতা ও মানবিকতা বৃদ্ধি করা। তাই আলেমরা বলছেন, নিজের প্রয়োজনের পাশাপাশি কোরবানির মাংসের একটি অংশ দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

তাদের মতে, সচেতনতা, স্বাস্থ্যবিধি ও শরিয়তের নির্দেশনা মেনে কোরবানির মাংস সংরক্ষণ ও বিতরণ করলে ঈদুল আজহার প্রকৃত শিক্ষা আরও বেশি বাস্তবায়িত হবে।


সম্পর্কিত নিউজ