কোর্ট ম্যারেজ মানেই কি বিয়ে? শরিয়াহ ও আইনের দৃষ্টিতে যা জানা জরুরি

কোর্ট ম্যারেজ মানেই কি বিয়ে? শরিয়াহ ও আইনের দৃষ্টিতে যা জানা জরুরি
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

বর্তমানে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে পরিচিত আদালত বা নোটারি কার্যালয়ে গিয়ে বিয়ের ঘোষণা দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। অনেক সময় পরিবারের অমত, আবেগ, সম্পর্কের চাপ কিংবা দ্রুত বিয়ে করার ইচ্ছা থেকে ছেলেমেয়েরা এ পথে হাঁটে।

কিন্তু ইসলামি শরিয়াহ ও বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আলোকে বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে পরবর্তী জীবনে বড় ধরনের ধর্মীয়, সামাজিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

 

শুধু স্বাক্ষর করলেই কি বিয়ে হয়ে যায়?

বাংলাদেশে প্রচলিত অর্থে “কোর্ট ম্যারেজ” বলতে সাধারণত নোটারি পাবলিক বা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে একটি হলফনামায় স্বাক্ষর করাকে বোঝানো হয়। অনেকেই মনে করেন, এই হলফনামায় স্বাক্ষর করলেই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়। কিন্তু ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, শুধু কাগজে স্বাক্ষর বা হলফনামা বিয়ের মূল আকদ নয়।

 

ইসলামে বিয়ে বা নিকাহ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো-ইজাব ও কবুল। অর্থাৎ এক পক্ষের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব এবং অন্য পক্ষের স্পষ্ট গ্রহণ। ইসলামি ফিকহভিত্তিক সূত্রগুলোতে বলা হয়েছে, নিকাহর জন্য ইজাব-কবুল এবং সাক্ষীদের উপস্থিতি অপরিহার্য। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, দুইজন পুরুষ সাক্ষী অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব-কবুল স্পষ্টভাবে সম্পন্ন হতে হবে।

 

ইসলামি স্কলার মুফতি রেজাউল করীম আবরার এ বিষয়ে বলেন, আমাদের দেশে প্রচলিত অনেক কোর্ট ম্যারেজে দেখা যায়, ছেলে-মেয়ে শুধু একটি ওকালতনামা বা হলফনামায় স্বাক্ষর করে ফিরে আসে। তারা মনে করে, এতেই বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু মুখে ইজাব-কবুল উচ্চারণ না হলে এবং শরিয়াহসম্মত সাক্ষী না থাকলে শুধু স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হয় না।

 

তিনি আরও বলেন, তালাকের ক্ষেত্রে লিখিত দলিলে স্বাক্ষর কার্যকর হতে পারে; কিন্তু বিয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। বিয়ে একটি আকদ বা চুক্তি, যা ইজাব-কবুলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তাই মুখে বলার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেবল স্বাক্ষর করে বিয়ের দাবি করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে যথেষ্ট নয়।

 

কখন কোর্ট ম্যারেজ বৈধ হতে পারে?

কোর্টে যাওয়া বা হলফনামা করা মানেই বিয়ে অবৈধ-এমনও নয়। যদি কাজি বা উপযুক্ত ব্যক্তি অন্তত দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে শরিয়াহসম্মতভাবে নিকাহ পড়ান, ছেলে ও মেয়ে স্পষ্টভাবে কবুল করেন এবং এরপর বিয়ে নিবন্ধন করা হয়, তাহলে সেই বিয়ে বৈধ হবে। অর্থাৎ মূল বিষয় হলো-শরিয়াহর নিয়ম মেনে আকদ সম্পন্ন হয়েছে কি না।

 

বাংলাদেশের আইনে মুসলিম বিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। মুসলিম ম্যারেজেস অ্যান্ড ডিভোর্সেস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৯৭৪ অনুযায়ী, মুসলিম আইনে সম্পন্ন প্রত্যেক বিয়ে আইন অনুযায়ী নিবন্ধন করতে হবে। যদি নিকাহ রেজিস্ট্রার নিজে বিয়ে পড়ান, তিনি তা নিবন্ধন করবেন; আর অন্য কেউ বিয়ে পড়ালে তা নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে রিপোর্ট করে নিবন্ধন করতে হবে।

 

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো-নিকাহ বা আকদ বিয়ের ধর্মীয় ভিত্তি, আর নিবন্ধন বিয়ের আইনগত প্রমাণ ও সরকারি স্বীকৃতির দলিল। শুধু হলফনামা নিকাহর বিকল্প নয়, আবার শুধু নিকাহ করে নিবন্ধন না করলেও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

 

বিয়ের জন্য বয়স, সম্মতি ও সাক্ষীর গুরুত্ব

বাংলাদেশে বিয়ের ক্ষেত্রে বয়সের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত আইনে ছেলে ২১ বছরের নিচে এবং মেয়ে ১৮ বছরের নিচে হলে তা শিশুবিবাহের আওতায় পড়ে। শিশুবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭–এ এ বয়সসীমা নির্ধারিত আছে।

 

এ ছাড়া উভয় পক্ষের স্বাধীন সম্মতি থাকতে হবে। জোরপূর্বক, ভয় দেখিয়ে, প্রতারণা করে বা চাপ সৃষ্টি করে বিয়ে করানো ইসলাম ও আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। নিকাহর সময় সাক্ষীদের উপস্থিতি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং বিয়ের সামাজিক স্বীকৃতি, প্রমাণ এবং পরবর্তী অধিকার রক্ষার জন্যও তা অত্যন্ত জরুরি।

 

অভিভাবকের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইসলামে বিয়েকে শুধু দুই ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয় না; এটি পরিবার, সমাজ ও দায়িত্বশীল জীবনের সূচনা। অভিভাবকের উপস্থিতি ও সম্মতি নিয়ে ফিকহি মাজহাবগুলোর মধ্যে আলোচনা আছে। হানাফি মাজহাবে প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের নারীর নিকাহ নির্দিষ্ট শর্তে অভিভাবক ছাড়া বৈধ হতে পারে বলে মত আছে। তবে শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি মাজহাবে অভিভাবক বা ওলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।

 

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় অভিভাবককে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গোপনে বিয়ে করলে পরে পারিবারিক বিরোধ, ভরণপোষণ, দেনমোহর, সন্তানের অধিকার, উত্তরাধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই শরিয়াহর ন্যূনতম শর্ত পূরণ হলেও পারিবারিকভাবে স্বচ্ছ ও সম্মানজনক পদ্ধতিতে বিয়ে করাই উত্তম।

 

দেনমোহর ও নিবন্ধন কেন জরুরি

নিকাহর সময় দেনমোহর নির্ধারণ করা নারীর অধিকার। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সংখ্যা নয়; বরং স্বামীর ওপর স্ত্রীর শরিয়াহসম্মত প্রাপ্য। অনেক কোর্ট ম্যারেজে দেনমোহর, সাক্ষী, নিবন্ধন ও বিয়ের পূর্ণ তথ্য সঠিকভাবে লেখা না থাকায় পরে সমস্যা দেখা দেয়।

 

কাবিননামা বা নিবন্ধিত বিয়ের দলিল থাকলে স্ত্রী ভরণপোষণ, দেনমোহর, তালাক, সন্তানের বৈধতা ও উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন আইনি অধিকার দাবি করতে পারেন। তাই শুধু হলফনামা নয়, শরিয়াহসম্মত নিকাহ ও সরকারি নিবন্ধন-দুটিই নিরাপদ পদ্ধতি।

 

ইসলামে সামাজিকভাবে বিয়ের গুরুত্ব

ইসলাম বিয়েকে পবিত্র, দায়িত্বপূর্ণ ও সামাজিকভাবে ঘোষিত একটি বন্ধন হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে। এজন্য বিয়ের পর ওলিমা বা ভোজের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো-বিয়ে গোপন না রেখে সমাজে জানানো, সম্পর্ককে বৈধভাবে প্রকাশ করা এবং পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে এতে সম্পৃক্ত করা।

 

গোপন সম্পর্ক, আবেগের বিয়ে বা শুধু কাগজে স্বাক্ষরের মাধ্যমে দাম্পত্য শুরু করলে পরবর্তীতে সন্দেহ, অস্বীকার, প্রতারণা ও অধিকারহীনতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত জীবনব্যাপী প্রভাব ফেলতে পারে।

 

তরুণদের জন্য সতর্কবার্তা

তারুণ্যের আবেগে বা পরিবারের সঙ্গে সাময়িক বিরোধের কারণে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিয়ে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তাই বিয়ের আগে শরিয়াহর শর্ত, আইনি নিয়ম, দেনমোহর, সাক্ষী, নিবন্ধন, পারিবারিক সম্মতি ও ভবিষ্যৎ দায়িত্ব-সবকিছু পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি।

 

পরিশেষে বলা যায়, কোর্ট ম্যারেজ নামে শুধু হলফনামায় স্বাক্ষর করা ইসলামি বিয়ে নয়। বিয়ে বৈধ হতে হলে ইজাব-কবুল, সাক্ষী, দেনমোহর এবং শরিয়াহসম্মত আকদ থাকতে হবে। আর বাংলাদেশে আইনগত সুরক্ষার জন্য বিয়ে নিবন্ধন করাও বাধ্যতামূলক। তাই তরুণ-তরুণীদের উচিত আবেগ নয়, শরিয়াহ ও আইনের সঠিক পথ অনুসরণ করে সম্মানজনকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া।


সম্পর্কিত নিউজ