{{ news.section.title }}
নবীজি (সা.) যে পশুর অংশগুলো খেতে অপছন্দ করতেন
ইসলাম শুধু কোন খাবার হালাল আর কোনটি হারাম- তা-ই নির্ধারণ করেনি; বরং খাবারের শুদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যগত দিক ও মানবিক রুচির প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ মানুষের জন্য পবিত্র, উপকারী ও উত্তম খাদ্যকে বৈধ করেছেন এবং অপবিত্র ও ক্ষতিকর জিনিস থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا
‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র আছে, তা থেকে আহার করো।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৬৮)
আমাদের সমাজে অনেক সময় হালাল পশুর সব অংশ খাওয়া নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা যায়। কেউ কেউ মনে করেন, যেহেতু পশুটি হালাল- তাই এর সব অংশই খাওয়া যাবে। অথচ ইসলামি শরিয়তে কিছু অংশ স্পষ্টভাবে হারাম করা হয়েছে এবং কিছু অংশ খাওয়াকে অপছন্দনীয় বা মাকরুহ বলা হয়েছে। বিশেষ করে কুরবানির সময় এ বিষয়গুলো জানা ও মানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
হালাল প্রাণীর রক্ত খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন-
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ
‘তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত এবং শূকরের মাংস।’ (সুরা আল-মায়িদা: আয়াত ৩)
আরও এসেছে-
قُل لَّآ أَجِدُ فِى مَآ أُوحِىَ إِلَىَّ مُحَرَّمًا عَلَىٰ طَاعِمٍ يَطْعَمُهُۥٓ إِلَّآ أَن يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَّسْفُوحًا
‘বলুন, আমার প্রতি যে ওহি নাজিল হয়েছে তাতে আমি ভক্ষণকারীর জন্য কোনো খাদ্য হারাম পাই না, তবে মৃত প্রাণী অথবা প্রবাহিত রক্ত হলে (তা হারাম)।’ (সুরা আল-আনআম: আয়াত ১৪৫)
অতএব, কুরবানির পশু হোক কিংবা অন্য কোনো হালাল প্রাণী- প্রবাহিত রক্ত খাওয়া সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। ইসলামি ফিকহবিদরা বলেছেন, জবাইয়ের পর যে রক্ত বের হয়ে যায় সেটিই “দামে মাসফুহ” বা প্রবাহিত রক্ত, যা খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ইসলামি গবেষকরা আরও বলেন, রক্ত মানবদেহের জন্যও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে জীবাণু ও ক্ষতিকর উপাদান থাকার আশঙ্কা থাকে। তাই ইসলাম ধর্মীয় বিধানের পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও এটি নিষিদ্ধ করেছে।
নবীজি (সা.) যেসব অংশ খাওয়া অপছন্দ করতেন
রাসুলুল্লাহ (সা.) হালাল প্রাণীর কিছু অংশ খাওয়া অপছন্দ করতেন। এ বিষয়ে হাদিস শরিফে এসেছে-
عَنْ مُجَاهِدٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَكْرَهُ مِنَ الشَّاةِ سَبْعًا: الدَّمَ، وَالْمَرَارَةَ، وَالْمَثَانَةَ، وَالْغُدَّةَ، وَالذَّكَرَ، وَالْأُنْثَيَيْنِ
তাবেয়ি হজরত মুজাহিদ (রহ.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বকরির সাতটি জিনিস খাওয়া অপছন্দ করতেন- প্রবাহিত রক্ত, পিত্ত, মূত্রথলি, মাংসগ্রন্থি, নর পশুর গুপ্তাঙ্গ এবং অণ্ডকোষ।’ (বায়হাকি)
অন্য হাদিসে এসেছে-
‘রক্ত ছাড়া হালাল পশুর অন্য কোনো অংশ হারাম নয়।’ তবে প্রিয় নবী (সা.)-এর অপছন্দনীয় অংশগুলো থেকে বিরত থাকাই উত্তম ও তাকওয়ার পরিচায়ক।
ইসলামি চিন্তাবিদরা বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পছন্দ-অপছন্দ একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন-
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِى رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
‘নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহর মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ২১)
যেসব অংশ না খাওয়াই উত্তম
হাদিসের আলোকে হালাল পশুর যেসব অংশ খাওয়া অপছন্দনীয়-
- প্রবাহিত রক্ত
- অণ্ডকোষ
- চামড়া ও গোশতের মাঝখানে সৃষ্ট জমাট মাংসগ্রন্থি
- মূত্রথলি
- পিত্ত
- নর ও মাদা পশুর গুপ্তাঙ্গ
ইসলামী শরিয়তে এসব অংশ খাওয়া থেকে বিরত থাকাকে উত্তম ও শোভন মনে করা হয়েছে। ফিকহবিদদের মতে, এগুলোর কিছু অংশ স্বভাবগতভাবেই অপবিত্র ও রুচিবিরুদ্ধ। তাই মুসলমানদের এসব এড়িয়ে চলা উচিত।
কুরবানির মাংস সংরক্ষণ ও বণ্টনেও রয়েছে ইসলামের নির্দেশনা
ইসলামে শুধু পশু জবাই নয়, বরং কুরবানির মাংস কীভাবে বণ্টন করতে হবে সে বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ
‘তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্ত দরিদ্রদেরও খাওয়াও।’ (সুরা আল-হজ: আয়াত ২৮)
ইসলামি স্কলারদের মতে, কুরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিবদের মধ্যে বণ্টন করা সুন্নাহ। এতে সমাজে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পায়।
পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রেও ইসলামের মানবিক শিক্ষা
ইসলাম প্রাণীর প্রতিও দয়া ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ওপর সদাচরণ ফরজ করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম)
হাদিসে আরও এসেছে, পশু জবাইয়ের সময় ছুরি ধারালো করতে এবং পশুকে কষ্ট না দিতে নির্দেশ দিয়েছেন নবীজি (সা.)। ইসলামি বিশেষজ্ঞরা বলেন, কুরবানি শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি তাকওয়া, ত্যাগ ও মানবিকতারও শিক্ষা দেয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে পরিচ্ছন্নতা ও উত্তম খাদ্যাভ্যাস
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও এটি মানুষকে পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতা ও উত্তম রুচির শিক্ষা দেয়। তাই শুধু হালাল হওয়াই যথেষ্ট নয়; প্রিয় নবী (সা.)-এর পছন্দ-অপছন্দকেও গুরুত্ব দেওয়া একজন মুমিনের দায়িত্ব।
বিশেষ করে কুরবানির মৌসুমে পশু জবাই, গোশত সংরক্ষণ ও বণ্টনের সময় এসব মাসআলা জানা থাকলে আমরা সুন্নাহসম্মত জীবনযাপনের আরও কাছাকাছি পৌঁছাতে পারব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান অর্জন ও আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।