{{ news.section.title }}
হরমুজের পথে ফ্রান্সের রণতরি ‘শার্ল দ্য গল’
হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি অবরোধে বৈশ্বিক নৌবাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় এবার সক্রিয় হচ্ছে ইউরোপ। সম্ভাব্য বহুজাতিক রক্ষণাত্মক মিশনের প্রস্তুতি হিসেবে ফ্রান্সের পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি শার্ল দ্য গল দক্ষিণ লোহিতসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ ও অবাধ নৌচলাচল পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শার্ল দ্য গল রণতরি বহর বুধবার সুয়েজ খাল অতিক্রম করে দক্ষিণ লোহিতসাগরের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। বহরে ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালি ও নেদারল্যান্ডসের যুদ্ধজাহাজও রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, পরিস্থিতি অনুকূল হলে যাতে দ্রুত মিশন বাস্তবায়ন করা যায়, সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই রণতরি বহরকে আগেভাগে অবস্থান বদল করানো হচ্ছে।
মাখোঁ এই উদ্যোগকে “সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক” এবং “যুদ্ধরত পক্ষগুলোর বাইরে থাকা” একটি মিশন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা। তিনি বলেছেন, সব পক্ষকে বিলম্ব ছাড়াই ও শর্তহীনভাবে অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং সংঘাতের আগের মতো পূর্ণ নৌচলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
ফ্রান্স ও ব্রিটেন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এমন একটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে, যার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা হবে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত এক ডজন দেশ এই উদ্যোগে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে ফরাসি পরিকল্পনা তাৎক্ষণিক সামরিক হস্তক্ষেপ নয়; বরং যুদ্ধের ঝুঁকি কমে এলে বাণিজ্যিক নৌচলাচল পুনরায় চালু করার জন্য প্রস্তুত একটি রক্ষণাত্মক ব্যবস্থা।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই পথ দিয়ে যায়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর এই রুটে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। পাল্টাপাল্টি অবরোধ, সামরিক সতর্কতা, জাহাজে হামলার ঝুঁকি এবং বীমা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে জাহাজ মালিক ও শিপিং কোম্পানিগুলো রুটটি ব্যবহার নিয়ে সতর্ক অবস্থানে আছে।
মাখোঁ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনালাপে এই উদ্যোগের কথা তোলেন। তিনি ইরানকে এই কূটনৈতিক সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান এবং জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও কথা বলতে চান। রয়টার্স জানিয়েছে, ফোনালাপে মাখোঁ হরমুজে নিরাপদ নৌচলাচলের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং ফ্রান্স-ব্রিটেনের যৌথ উদ্যোগে একটি আন্তর্জাতিক মিশনের প্রস্তাব দেন।
ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, পেজেশকিয়ান ফ্রান্সের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের কূটনৈতিক পথ অনুসরণের প্রস্তুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাসও প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, ইরান নিজের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে আপস করবে না।
ফরাসি উদ্যোগটি যুক্তরাষ্ট্রের স্থগিত হওয়া ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ থেকে আলাদা। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজে আটকে থাকা জাহাজ বের করে আনতে সামরিক মিশন শুরু করেছিল, কিন্তু আঞ্চলিক আপত্তি ও ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার অগ্রগতির কারণে সেটি স্থগিত করা হয়। মাখোঁর পরিকল্পনা তুলনামূলকভাবে বহুপাক্ষিক, কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষামূলক কাঠামোয় সাজানো হচ্ছে, যাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই নৌচলাচল স্বাভাবিক করার পথ খোঁজা যায়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, শার্ল দ্য গল রণতরির অবস্থান পরিবর্তন শুধু সামরিক প্রস্তুতি নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তাও। ফ্রান্স দেখাতে চাইছে, হরমুজ সংকট কেবল যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের বিষয় নয়, বরং ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। একই সঙ্গে এটি জাহাজ মালিক, বীমা কোম্পানি ও জ্বালানি বাজারকে আস্থা দেওয়ারও চেষ্টা।
তবে মিশন বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চিত। ইরান এই উদ্যোগে কীভাবে সাড়া দেবে, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধে ছাড় দেবে কি না, এবং হরমুজে নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল হয়-এসবের ওপর নির্ভর করবে ফ্রান্স-ব্রিটেনের প্রস্তাব বাস্তবে কতদূর এগোয়। আপাতত শার্ল দ্য গল রণতরির দক্ষিণ লোহিতসাগরে অগ্রসর হওয়া দেখাচ্ছে, ইউরোপ হরমুজ সংকটের সমাধানে কূটনীতি ও সামরিক প্রস্তুতি-দুই পথই খোলা রাখছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স