{{ news.section.title }}
ইরানে গোপন হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব?
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের মধ্যে নতুন এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে এসেছে। পশ্চিমা ও ইরানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের হামলার জবাবে সৌদি আরব গোপনে ইরানের ভেতরে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে। বিষয়টিকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মার্চের শেষ দিকে সৌদি বিমানবাহিনী এই গোপন অভিযান পরিচালনা করে। যদিও হামলার নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বা ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইরানের হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেয় রিয়াদ। তাদের দাবি, সৌদি আরবের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং এরই অংশ হিসেবে গোপন বিমান অভিযান চালানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই তথ্য সত্য হয়ে থাকে, তবে এটিই হবে প্রথম ঘটনা যেখানে সৌদি আরব সরাসরি ইরান-এর ভূখণ্ডে সামরিক হামলা চালিয়েছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় আগের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাচ্ছে রিয়াদ। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একইভাবে নীরব রয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-ও। ফলে ঘটনাটি নিয়ে ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা চালানোর পর থেকেই গোটা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)ভুক্ত কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় বলে দাবি করা হয়েছে।
এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং কিছু বেসামরিক এলাকাও ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় তেহরান, যার প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম The Wall Street Journal-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছিল। তবে ইরানকে ঘিরে সৌদি আরব ও আমিরাতের কৌশলগত অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আমিরাত তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থান নিলেও সৌদি আরব শুরু থেকেই উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে। রিয়াদ বিভিন্ন পর্যায়ে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখে। এমনকি সৌদি আরবে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমেও আলোচনা চলছিল বলে কূটনৈতিক সূত্রের দাবি। এক সৌদি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা সবসময় উত্তেজনা কমানো, সংযম প্রদর্শন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পক্ষে।’
পশ্চিমা ও ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, গোপন হামলার পর সৌদি আরব ইরানকে স্পষ্ট বার্তা দেয়-ভবিষ্যতে আর হামলা হলে তার জবাব আরও কঠোরভাবে দেওয়া হবে। এরপর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা গড়ে ওঠে বলেও দাবি করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে বিবেচিত ইরান ও সৌদি আরব। ইয়েমেন, সিরিয়া, লেবাননসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে দুই দেশ ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। তবে ২০২৩ সালে চীন-এর মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ শুরু হয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের যুদ্ধবিরতিও কার্যকর ছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক এই সংঘাত ও গোপন সামরিক অভিযানের খবর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। যদিও একই সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি বলেও মনে করছেন তারা।
রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, ২৫ থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় ১০৫টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। তবে ১ থেকে ৬ এপ্রিলের মধ্যে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৫টির কিছু বেশি। পশ্চিমা সূত্রগুলোর দাবি, সৌদি আরবের কূটনৈতিক ও সামরিক বার্তার পরই হামলার মাত্রা কমতে শুরু করে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স