হরমুজ প্রণালির কাছে এখনো আটকে আছে ১৬০০ জাহাজ

হরমুজ প্রণালির কাছে এখনো আটকে আছে ১৬০০ জাহাজ
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌচলাচল এখনো ফিরেনি। আন্তর্জাতিক শিপিং ও ট্র্যাকিং সূত্রের তথ্য বলছে, প্রণালির দুই পাশে এখনো বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ অপেক্ষায় রয়েছে।

কিছু সূত্রে আটকে থাকা বা পারাপারের অপেক্ষায় থাকা জাহাজের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ বলা হচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রায় ১ হাজার ৫০০ জাহাজ প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় আছে এবং তাদের ইরানের নতুন নিরাপত্তা প্রটোকল মেনে চলতে বলা হয়েছে।

 

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। তাই এই জলপথে অচলাবস্থা শুধু একটি আঞ্চলিক সামরিক সংকট নয়; এটি জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা, বীমা ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনের খরচের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আল জাজিরার আগের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল ৯৫ শতাংশের বেশি কমে যায় এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও মাত্র অল্পসংখ্যক জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজে আটকে থাকা জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি পার করাতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি উদ্যোগ নেন। তবে অভিযানটি ৪৮ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয়নি। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির অগ্রগতির কথা বলে এই উদ্যোগ সাময়িকভাবে স্থগিত করেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, প্রণালিতে আটকে থাকা জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনতে তারা সহায়তা করবে।

 

অভিযান শুরুর পরও জাহাজ চলাচলে বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের ঘোষণার পরদিনও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির ছিল। মেরিনট্রাফিকের তথ্যের ভিত্তিতে রয়টার্স জানায়, ওই দিন মাত্র একটি ট্যাংকার, কয়েকটি পণ্যবাহী জাহাজ এবং একটি কেবল বসানোর জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করে। বড় আকারে বাণিজ্যিক জাহাজের সারি বা পারাপারের প্রস্তুতির কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। জার্মান শিপিং কোম্পানি হ্যাপাগ-লয়েডও জানিয়েছে, নিরাপদ পারাপারের প্রক্রিয়া স্পষ্ট না হওয়ায় তাদের জাহাজের জন্য প্রণালি পার হওয়া সম্ভব নয়।

 

শিপিং কোম্পানিগুলোর বড় উদ্বেগ হলো নিরাপত্তা নিশ্চয়তার অভাব। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি জাহাজগুলোকে সতর্ক করে জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া বা নির্ধারিত রুট না মেনে প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দেখা এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে অবস্থানরত জাহাজগুলোকে নতুন ইরানি প্রটোকল মেনে চলতে হবে।

 

এই পরিস্থিতিতে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি নিয়ে নিজ উদ্যোগে হরমুজ পার হতে চাইছে না। তাদের আশঙ্কা, সামান্য ভুল সংকেত, অনুমোদন বিভ্রাট, সামরিক ভুল বোঝাবুঝি বা ড্রোন/ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পুরো জাহাজ, পণ্য ও ক্রুদের বিপদের মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে তেলবাহী ট্যাংকার, এলএনজি ক্যারিয়ার এবং বড় কনটেইনার জাহাজের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি। একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি কোম্পানির ক্ষতি নয়; তা সমুদ্রদূষণ, জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং বৈশ্বিক বাজারে নতুন ধাক্কার কারণ হতে পারে।

 

হরমুজে অচলাবস্থার কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পূর্ব উপকূলের ফুজাইরাহ ও খোর ফাক্কান বন্দরের গুরুত্ব বেড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ কার্যত বন্ধ থাকায় এসব বন্দর এখন উপসাগরীয় বাণিজ্যের বিকল্প লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে। ফুজাইরাহ দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রপ্তানি বেড়েছে এবং খোর ফাক্কানে কনটেইনার চলাচল কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই বিকল্প ব্যবস্থাও পুরো উপসাগরীয় বাণিজ্যের চাপ সামলানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোও পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন কাঠামো খুঁজছে। ফ্রান্স তার বিমানবাহী রণতরি শার্ল দ্য গল লোহিতসাগরের দিকে পাঠিয়েছে, যাতে হরমুজে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার সম্ভাব্য বহুজাতিক মিশনে প্রস্তুত থাকা যায়। ফরাসি উদ্যোগটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রজেক্ট ফ্রিডম থেকে আলাদা এবং সেটিকে যুদ্ধরত পক্ষের বাইরে একটি রক্ষণাত্মক মিশন হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

 

তবে বাস্তবে এখনো পরিস্থিতি ভঙ্গুর। ইরান একদিকে বলছে, অনুমতি ও প্রটোকল মেনে চললে জাহাজ চলাচল নিরাপদ হতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বহাল রেখেছে। ফলে একই জলপথে দুই পক্ষের ভিন্ন নিয়ন্ত্রণ-দাবি শিপিং কোম্পানিগুলোকে দ্বিধায় ফেলছে। একদিকে ইরানের অনুমতি ছাড়া যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ; অন্যদিকে মার্কিন অবরোধের আওতায় ইরানসংশ্লিষ্ট রুটে চলাচল করলে নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক ঝুঁকির আশঙ্কা আছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ সংকটের সমাধান শুধু সামরিক এসকর্ট দিয়ে সম্ভব নয়। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সত্যিকারের স্বাভাবিক করতে হলে তিনটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার-প্রথমত, ইরানের নিরাপত্তা প্রটোকল কীভাবে কার্যকর হবে; দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কতটা শিথিল হবে; তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্য বীমা ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কে দেবে।

 

তথ্যসূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল


সম্পর্কিত নিউজ