{{ news.section.title }}
মমতার বিশ্বস্ত সহকর্মী থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পালাবদলের কেন্দ্রে এখন শুভেন্দু অধিকারী।
একসময় মমতা ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম সংগঠক হিসেবে পরিচিত এই নেতা এবার পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন। শনিবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। সেখানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীরও।
শুক্রবার বিজেপি বিধায়ক দলের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে শুভেন্দু অধিকারীর নাম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বৈঠকে পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। পরে শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যপাল আরএন রভির হাতে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক দাবি জানান।
বিজেপির ঐতিহাসিক জয়
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয় পেয়েছে বিজেপি। এর মাধ্যমে টানা ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিজেপি।
ভারতের জনসংঘ প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর রাজ্যে ক্ষমতায় আসা বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল। ২০২১ সালের নির্বাচনে ব্যর্থ হওয়ার পর এবার সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিল শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে।
মমতার বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথির রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম শুভেন্দু অধিকারীর। তার বাবা শিশির অধিকারী ছিলেন কংগ্রেসের পরিচিত নেতা। পরে মমতা ব্যানার্জী কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলে অধিকারী পরিবারও তার সঙ্গে যোগ দেয়।
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয় ছাত্র রাজনীতি দিয়ে। পরে কাঁথি পৌরসভার কাউন্সিলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০৬ সালে কাঁথি দক্ষিণ আসন থেকে প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হন।
নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সংগঠক
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় আসে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়। বামফ্রন্ট সরকারের প্রস্তাবিত রাসায়নিক শিল্প হাবের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
যদিও আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন মমতা ব্যানার্জী, মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তোলার অন্যতম কারিগর ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। এই আন্দোলনই পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বাম শাসনের পতনের ভিত্তি তৈরি করে।
২০০৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে সিপিআইএম নেতা লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন শুভেন্দু। এরপর তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।

অভিষেকের উত্থান, দূরত্বের শুরু
২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ফিরে এসে মমতা ব্যানার্জীর মন্ত্রিসভায় পরিবহনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন শুভেন্দু অধিকারী। একই সময়ে দলের যুব সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পান তিনি।
তবে ধীরে ধীরে মমতা ব্যানার্জীর ভাতিজা অভিষেক ব্যানার্জীর উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দলের দূরত্ব বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার কারণেই শুভেন্দুর অসন্তোষ বাড়ে।
বিজেপিতে নাটকীয় যোগদান
অবশেষে ২০২০ সালে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসনে মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জয় পান শুভেন্দু। এরপর থেকেই বিজেপির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। এবার ভবানীপুরেও মমতা ব্যানার্জীকে হারিয়ে কার্যত জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় উঠে এসেছেন তিনি।
অনেক ভারতীয় গণমাধ্যম তাকে ‘জায়ান্ট কিলার’ বলেও আখ্যা দিয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে শুভেন্দু
তবে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবন বিতর্কমুক্ত নয়। মুসলিম ভোটার, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে একাধিকবার বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন তিনি।
২০২১ সালে তার একটি বক্তব্য নিয়ে নির্বাচন কমিশন নোটিশও দিয়েছিল। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা থেকেও একসময় তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের অভিযোগে।
নারদা স্টিং অপারেশনেও তার নাম উঠে আসে। যদিও সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শুভেন্দু অধিকারী।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বড় পরীক্ষা
রাজনৈতিকভাবে আক্রমণাত্মক নেতা হিসেবে পরিচিত শুভেন্দু অধিকারীর সামনে এখন প্রশাসনিক নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, কর্মসংস্থান সংকট এবং বিনিয়োগ ঘাটতি তার সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
একসময় যে নেত্রীকে সামনে রেখে নিজের রাজনৈতিক উত্থান ঘটিয়েছিলেন, এখন সেই মমতা ব্যানার্জীকেই পরাজিত করে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে গেলেন শুভেন্দু অধিকারী। তার এই উত্থান শুধু একজন নেতার রাজনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গের বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি।