ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ২০ বছর স্থগিত থাকলেই যথেষ্ট: ট্রাম্প

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ২০ বছর স্থগিত থাকলেই যথেষ্ট: ট্রাম্প
ছবির ক্যাপশান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প | ছবি: এএফপি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ২০ বছরের জন্য স্থগিত করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সেটি মেনে নিতে পারে। ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ এতদিন ওয়াশিংটনের অবস্থান ছিল- ইরানকে স্থায়ীভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে এবং দেশটিকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেওয়া যাবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে চলমান ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির অবরোধ, বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন এখন বাস্তবসম্মত সমঝোতার দিকে এগোতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

বেইজিং সফর শেষে এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন,

“২০ বছরই যথেষ্ট। তবে তাদের পক্ষ থেকে শক্ত নিশ্চয়তা থাকতে হবে। অর্থাৎ সত্যিকারের ২০ বছর হতে হবে।”

 

তবে তিনি এই “২০ বছরের স্থগিতাদেশ” কীভাবে কার্যকর হবে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ কেমন হবে কিংবা ইরানের বিদ্যমান ইউরেনিয়াম মজুদের বিষয়ে কী পরিকল্পনা রয়েছে- সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

 

স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা থেকে ‘দীর্ঘমেয়াদি স্থগিতাদেশ’: বদলাচ্ছে কি মার্কিন অবস্থান?

ডোনাল্ড ট্রাম্প এতদিন প্রকাশ্যে বলে আসছিলেন, ইরানকে অবশ্যই স্থায়ীভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। গত কয়েক মাসেও তিনি বারবার বলেছেন-

“The only thing that matters… they can’t have a nuclear weapon.”

কিন্তু এবার প্রথমবারের মতো তিনি প্রকাশ্যে “২০ বছরের স্থগিতাদেশ”কে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে উল্লেখ করলেন।

 

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময় এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনায় সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যুতে। এর আগে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত গোপন শান্তি আলোচনায় ইরান পাঁচ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছিল বলে মার্কিন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু তখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ন্যূনতম ২০ বছরের সময়সীমার কথা তুলেছিলেন। এবার ট্রাম্প নিজে সেই ২০ বছরের শর্ত প্রকাশ্যে উল্লেখ করায় আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

 

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ?

পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদন ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মূল উপাদান হলো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। সাধারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কম মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার হলেও অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন প্রায় ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতা। বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, ইরানের কাছে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় মজুদ রয়েছে। যদি তা আরও সমৃদ্ধ করা হয়, তাহলে তেহরান দ্রুত অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম উৎপাদনে সক্ষম হতে পারে।

 

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের কিছু পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির পুরো কর্মসূচি ধ্বংস হয়নি। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান চাইলে এখনো প্রায় এক বছরের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

 

মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটও সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান “frighteningly close” বা ভয়ংকরভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।

 

২০১৫ সালের চুক্তি ও ‘সানসেট ক্লজ’ বিতর্ক

ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে বর্তমান সংকটের শিকড় অনেকটাই ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি- জেসিপিওএ (JCPOA)-তে। বারাক ওবামা প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, চীন ও ইরানের মধ্যে ওই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তির আওতায় ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে কঠোর সীমাবদ্ধতা মেনে নেয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ গ্রহণ করে। এর বিনিময়ে তেহরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়।

 

কিন্তু ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন। তিনি চুক্তিটিকে “the worst deal ever” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান আপত্তিগুলোর একটি ছিল তথাকথিত “সানসেট ক্লজ”।

এই ধারাগুলোর কারণে নির্দিষ্ট সময় পর ইরানের ওপর আরোপিত কিছু সীমাবদ্ধতা ও নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিথিল হয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। নেতানিয়াহুর অভিযোগ ছিল, এতে ভবিষ্যতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে।

 

যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলেও আলোচনায় অচলাবস্থা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ সংঘাত চলতে থাকে। ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল কার্যত বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। বিক্ষিপ্ত হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং কূটনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য অব্যাহত রয়েছে।

 

ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, তেহরানের প্রস্তাবে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, ইরানি বন্দরে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে আর হামলা না করার নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ।

 

চীন, হরমুজ প্রণালি ও নতুন ভূরাজনীতি

চীন সফর শেষে ট্রাম্প দাবি করেন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে তার এ বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে যে ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যাবে না। তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে হবে। বর্তমানে ইরানের অবরোধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ ওই নৌপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের বড় অংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে যায়। ফলে এই রুটে অস্থিরতা পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প এমনকি ইরানি তেল কেনা চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ও বিবেচনা করছেন।

 

ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান

যদিও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে কিছু নমনীয়তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ইসরায়েল এখনো কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পুরোপুরি সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে ধরা যাবে না। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, ইরানের যেকোনো সীমিত পারমাণবিক সক্ষমতাও ভবিষ্যতে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে কী বোঝাচ্ছে ট্রাম্পের মন্তব্য

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই নতুন অবস্থান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করছে-

  • যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এখন “সম্পূর্ণ ধ্বংস” নয়, বরং “দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ”কে বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে।
  • চলমান যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের অর্থনৈতিক চাপ ওয়াশিংটনকে কূটনৈতিক সমঝোতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
  • চীন, পাকিস্তান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যস্থতা এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
  • তবে ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান ভবিষ্যৎ আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আলোচনায় অগ্রগতি না হলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হতে পারে, যার প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ