{{ news.section.title }}
ইসরাইলের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র কৌশলে বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের ধরন, বাড়ছে বিশ্বজুড়ে ভয় ও অনিশ্চয়তা
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনার নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে ইসরাইলের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নতুন কৌশল। কাতার ও ইরানে সাম্প্রতিক হামলাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি প্রবেশ না করেই হাজার কিলোমিটার দূর থেকে নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আল জাজিরায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় হামলা চালায় ইসরাইল। লক্ষ্য ছিল হামাস নেতাদের একটি বৈঠক, যেখানে যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হামলার সময় ইসরাইলি যুদ্ধবিমান কাতারের আকাশসীমায় প্রবেশই করেনি। আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে আঘাত হানা হয়।
একই ধরনের কৌশল পরে ইরানেও ব্যবহার করা হয়। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যৌথ অভিযানের শুরুতে তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কমপ্লেক্সকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই হামলা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে- এখন আর শত্রুপক্ষের আকাশসীমায় ঢুকতে না পারলেও দূর থেকে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে আঘাত হানা সম্ভব।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরাইল এই হামলায় সাধারণ বোমাবর্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করেনি। বরং অত্যাধুনিক নজরদারি, সাইবার প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামরিক তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত এক বিশেষ যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করেছে। এর মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান, সময় ও গতিবিধি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কাতার হামলার সময় একটি ইসরাইলি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান নেয়। এরপর সেখান থেকে “সিলভার স্প্যারো” নামের একটি আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রথমে মহাকাশের কাছাকাছি উচ্চতায় উঠে যায়, এরপর অতিদ্রুত গতিতে প্রায় উল্লম্বভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের গতি এত বেশি যে প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিক্রিয়া জানানোর সময়ই পায় না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকেও এসব ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাধারণ পর্যবেক্ষণ সীমার বাইরে উঠে গিয়ে পরে হঠাৎ করে নিচে নেমে আসে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরাইলের এই প্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুদ্ধবিমানের সফটওয়্যার ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা। অর্থাৎ ক্ষেপণাস্ত্র, লক্ষ্য নির্ধারণ ও হামলার পুরো সিদ্ধান্ত ইসরাইল নিজস্বভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। অথচ একই ধরনের মার্কিন যুদ্ধবিমান ব্যবহার করলেও সৌদি আরব বা কাতারের মতো দেশগুলো এই পর্যায়ের স্বাধীনতা পায়নি।
এ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্ন উঠেছে- যুক্তরাষ্ট্র কেন কিছু মিত্রকে পূর্ণ প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা দেয়, আবার অন্যদের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে?
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল এই হামলার মাধ্যমে শুধু নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করেনি, বরং নতুন ধরনের যুদ্ধের পথও খুলে দিয়েছে। এখন বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশ একই ধরনের প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর কাছে এমন প্রযুক্তি তৈরির সক্ষমতা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়লে ভবিষ্যতের যুদ্ধ আরও ভয়ংকর ও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। কারণ তখন কোনো দেশই ভৌগোলিক দূরত্ব বা সীমান্তকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে ধরে নিতে পারবে না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো সম্ভব হবে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতি বিশ্বনেতাদের জন্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। কারণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ক্রমেই কমে আসবে। আগে যেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতি মূল্যায়নে দিন বা সপ্তাহ সময় পাওয়া যেত, ভবিষ্যতে হয়তো কয়েক মিনিটের মধ্যেই বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই প্রযুক্তি শুধু যুদ্ধ নয়, রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কৌশলগত আধিপত্য বিস্তারেও ব্যবহার হতে পারে। ফলে বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক নতুন অনিশ্চয়তার যুগ শুরু হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা