{{ news.section.title }}
ডায়াবেটিস থাকলেও কি আম-লিচু খাওয়া যাবে? বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
গরমকাল মানেই রসালো ফলের উৎসব। বাজারজুড়ে এখন আম, লিচু, কাঁঠালসহ নানা মৌসুমি ফলের সমারোহ। বিশেষ করে আম ও লিচুর প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকে সবচেয়ে বেশি। স্বাদ, ঘ্রাণ ও পুষ্টিগুণ-সব মিলিয়ে এই দুই ফল গ্রীষ্মের অন্যতম আকর্ষণ। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের মনে প্রতি বছরই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়-‘আম বা লিচু কি খাওয়া যাবে?’
অনেকেই মনে করেন, ডায়াবেটিস থাকলে মিষ্টিজাতীয় ফল পুরোপুরি বাদ দিতে হবে। কিন্তু পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। পরিমিত পরিমাণে এবং সঠিক নিয়ম মেনে খেলে ডায়াবেটিস রোগীরাও আম ও লিচুর স্বাদ নিতে পারেন।
আমে কী কী পুষ্টিগুণ আছে?
পুষ্টিবিদদের মতে, আম অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি ফল। এতে রয়েছে ডায়েটারি ফাইবার, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এসব উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখা, ত্বক উজ্জ্বল রাখা এবং হজমশক্তি উন্নত করতেও আম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক কাপ পাকা আমে প্রায় ৩ গ্রাম ফাইবার থাকে, যা হজমে সহায়ক এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। আমে থাকা বিটা-ক্যারোটিন শরীরে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত হয়, যা চোখের জন্য উপকারী। এছাড়া আমে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ফ্রি-র্যাডিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সহায়তা করে।
তবে আমে প্রাকৃতিক শর্করার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। পুষ্টিবিদদের তথ্য অনুযায়ী, আমের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) প্রায় ৫৬-৬০ এবং গ্লাইসেমিক লোড (GL) ১৮-১৯ এর মধ্যে। ফলে অতিরিক্ত আম খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
ডায়াবেটিস রোগীরা কীভাবে আম খাবেন?
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে অল্প পরিমাণে আম খাওয়া যেতে পারে। তবে এর জন্য কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
যে বিষয়গুলো মানতে হবে
- দিনে মোট কত ক্যালোরি ও কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করা হচ্ছে, তা হিসাব রাখতে হবে।
- একবেলা আম খেলে অন্য খাবার থেকে কিছু কার্বোহাইড্রেট কমাতে হবে।
- ভারী খাবারের সঙ্গে আম না খাওয়াই ভালো।
- রাতের খাবারের পর আম খাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে।
- সকালের নাশতা বা সকাল-বিকালের মাঝামাঝি সময়ে আম খাওয়া তুলনামূলক নিরাপদ।
- একসঙ্গে বেশি না খেয়ে ছোট ছোট টুকরো করে ভাগ করে খাওয়া ভালো।
পুষ্টিবিদদের মতে, আমের সঙ্গে প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর ফ্যাটযুক্ত খাবার খেলে রক্তে শর্করার ওঠানামা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। যেমন-বাদাম, টকদই বা ওটসের সঙ্গে আম খাওয়া যেতে পারে।
লিচু কি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ক্ষতিকর?
ছোট্ট রসালো ফল লিচুর প্রায় ৮১ শতাংশই পানি। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, কপার, ফাইবার ও বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এছাড়া লিচুতে স্যাপোনিন, স্টিগমারস্টেরল, লিউকোসায়ানডিন, মালভিডিন ও গ্লাইকোসাইডসের মতো ফাইটোকেমিক্যালও পাওয়া যায়। এসব উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লিচুর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স প্রায় ৫০, যা মাঝারি মাত্রার। অন্যদিকে এর গ্লাইসেমিক লোড প্রায় ৭.৬, যা তুলনামূলক নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে পরিমিত পরিমাণে লিচু খেলে ডায়াবেটিস রোগীদের বড় ধরনের সমস্যা নাও হতে পারে।
লিচুর যেসব উপকারিতা রয়েছে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিচুতে থাকা ফাইবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এতে কোলেস্টেরলও নেই। এছাড়া এতে থাকা ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ইনসুলিন উৎপাদন উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে।
সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, লিচুর বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ ম্যাক্রোফেজ উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। ডায়াবেটিস রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় এই দিকটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কতটুকু লিচু খাওয়া নিরাপদ?
চিকিৎসকদের মতে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে দিনে ৫-৬টি মাঝারি আকারের লিচু খাওয়া যেতে পারে। তবে একসঙ্গে অনেকগুলো লিচু খাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে খালি পেটে লিচু খাওয়া এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
পুষ্টিবিদরা আরও বলছেন-
- সকালের দিকে লিচু খাওয়া ভালো।
- ভারী খাবারের পরপর লিচু খাওয়া উচিত নয়।
- লিচুর সঙ্গে কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার যেমন বাদাম বা শসা খেলে ভালো।
- অতিরিক্ত লিচু খেলে ওজন বৃদ্ধি, গ্যাস্ট্রিক ও রক্তে সুগার বেড়ে যেতে পারে।
কৃত্রিমভাবে পাকানো আম নিয়ে সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে অনেক সময় কৃত্রিমভাবে পাকানো আম বিক্রি করা হয়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে ফল পাকালে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই প্রাকৃতিকভাবে পাকানো আম বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
চিকিৎসকদের মতে, শুধু আম বা লিচু নয়-যেকোনো মিষ্টিজাতীয় ফল খাওয়ার ক্ষেত্রেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পানি পান এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখলে মৌসুমি ফলও উপভোগ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ফল খাওয়ার পর শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া করছে তা লক্ষ্য করাও জরুরি। প্রয়োজনে ফল খাওয়ার পর রক্তে সুগারের মাত্রা পরীক্ষা করতে পারেন। এতে নিজের শরীরের সহনশীলতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হবে।