বারবার গরম করা খাবার কতটা ক্ষতিকর, লিভারের ঝুঁকি কোথায়?

বারবার গরম করা খাবার কতটা ক্ষতিকর, লিভারের ঝুঁকি কোথায়?
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি লিভার। প্রতিদিন এটি রক্ত থেকে টক্সিন ও বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে বের করে, পিত্ত তৈরি করে, খাবার হজমে সহায়তা করে, শক্তি সঞ্চয় করে এবং শরীরের বিপাকক্রিয়া সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই লিভারের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত চাপ পড়লে তা ফ্যাটি লিভার, প্রদাহ, সিরোসিস এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

বর্তমানে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, বারবার ভাজা খাবার, অ্যালকোহল, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের কারণে লিভারজনিত রোগ বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, লিভারকে সুস্থ রাখতে শুধু কী খাচ্ছি তা নয়, খাবার কীভাবে রান্না, সংরক্ষণ ও পুনরায় গরম করা হচ্ছে-সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

 

অনেকেই মনে করেন, ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবার আবার গরম করলেই তা নিরাপদ হয়ে যায়। কিন্তু সব খাবারের ক্ষেত্রে বিষয়টি এক নয়। কিছু খাবার ভুলভাবে সংরক্ষণ করলে তাতে ব্যাকটেরিয়া বা টক্সিন তৈরি হতে পারে, যা পুনরায় গরম করলেও পুরোপুরি নষ্ট হয় না। আবার কিছু খাবার অতিরিক্ত তাপে বা বারবার গরম করলে রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হতে পারে।

 

১. বারবার গরম করা তেল ও ভাজাপোড়া খাবার

একই তেল বারবার গরম করে ভাজাপোড়া খাবার তৈরি করা স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাসগুলোর একটি। উচ্চ তাপে তেল ভাঙতে শুরু করে এবং অক্সিডেশন, পলিমারাইজেশন ও অন্যান্য রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বারবার ব্যবহৃত বা অতিরিক্ত উত্তপ্ত তেলে অ্যালডিহাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হয়, যেগুলোর মিউটাজেনিক ও জিনোটক্সিক প্রভাব নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনা আছে।

 

এই ধরনের তেলে তৈরি খাবার নিয়মিত খেলে শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়তে পারে। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস লিভার কোষের ক্ষতি, প্রদাহ, ফ্যাটি লিভার এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা বিপাকজনিত জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ছাড়া ট্রান্স ফ্যাট হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়-এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ স্পষ্ট সতর্কতা দিয়েছে।

 

২. গরম করা ভাত: আসল ঝুঁকি গরম করা নয়, ভুল সংরক্ষণ

রান্না করা ভাত নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা আছে। ভাত আবার গরম করলেই যে তা বিষাক্ত হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। আসল ঝুঁকি হলো-রান্না করা ভাত দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া। ফুড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সি জানিয়েছে, ভাতে থাকা Bacillus cereus ব্যাকটেরিয়ার স্পোর রান্নার পরও বেঁচে থাকতে পারে। ভাত যদি দীর্ঘ সময় বাইরে পড়ে থাকে, তাহলে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পেয়ে টক্সিন তৈরি করতে পারে; পরে ভাত গরম করলেও সেই টক্সিন পুরোপুরি নষ্ট নাও হতে পারে।

 

এ ধরনের খাবার খেলে বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা ও খাদ্যবিষক্রিয়া হতে পারে। তাই ভাত রান্নার পর দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখতে হবে এবং সম্ভব হলে এক দিনের মধ্যে খেয়ে ফেলা ভালো। গরম করার সময় ভাত পুরোপুরি গরম হয়েছে কি না নিশ্চিত করতে হবে।

 

৩. আলু ও অতিরিক্ত ভাজা স্টার্চজাত খাবার

আলু, পাউরুটি, বিস্কুট, চিপস বা অন্যান্য স্টার্চজাত খাবার উচ্চ তাপে ভাজা, বেক বা রোস্ট করলে অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হতে পারে। এফডিএ জানিয়েছে, অ্যাক্রিলামাইড মূলত উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকা শর্করা ও অ্যামিনো অ্যাসিডের প্রাকৃতিক বিক্রিয়ায় তৈরি হয়, বিশেষ করে ভাজা, বেক করা ও রোস্ট করার সময়।

 

আইএআরসি অ্যাক্রিলামাইডকে “সম্ভাব্য মানব কার্সিনোজেন” বা Group 2A হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এর মানে হলো, প্রাণী গবেষণায় ক্যান্সারের প্রমাণ শক্তিশালী, তবে মানুষের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রমাণ সীমিত। তাই আতঙ্কিত না হয়ে রান্নার পদ্ধতিতে সতর্ক হওয়া জরুরি। অতিরিক্ত পোড়া, কালচে বা খুব বেশি কড়কড়ে করে ভাজা আলু ও স্টার্চজাত খাবার কম খাওয়া ভালো।

 

৪. মুরগি, ডিম ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার

মুরগি, ডিম, মাছ বা মাংস আবার গরম করার ক্ষেত্রে প্রধান ঝুঁকি হলো ভুল সংরক্ষণ ও অসম গরম হওয়া। এসব প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রান্নার পর দীর্ঘ সময় বাইরে রেখে দিলে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বাড়তে পারে। পরে গরম করলেও খাবারের ভেতরের অংশ যদি পর্যাপ্ত তাপে না পৌঁছায়, তাহলে খাদ্যবিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে।

 

উচ্চ তাপে মাংস রান্না বা বারবার ভাজা হলে হেটেরোসাইক্লিক অ্যামিনসহ কিছু ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে “একবার গরম করা ডিম বা মুরগি সরাসরি লিভার ক্যান্সার করে”-এমন সরল দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে সতর্কতার সঙ্গে বলা উচিত। সঠিকভাবে ফ্রিজে রাখা, একবার গরম করা এবং পুরোপুরি গরম করে খেলে ঝুঁকি অনেক কমে।

 

৫. শাকসবজি, নাইট্রেট ও পুনরায় গরম করার সতর্কতা

পালং শাক, বিট, গাজর, বাঁধাকপি, লেটুস ও সেলারির মতো কিছু সবজিতে প্রাকৃতিকভাবে নাইট্রেট থাকে। ফুড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সি জানিয়েছে, নাইট্রেট ও নাইট্রাইট সবজিতেও প্রাকৃতিকভাবে থাকে এবং অনুমোদিত মাত্রায় খাদ্যে ব্যবহৃত নাইট্রেট/নাইট্রাইটকে নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ভুলভাবে সংরক্ষণ, দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা এবং বারবার গরম করলে কিছু ক্ষেত্রে নাইট্রাইট ও নাইট্রোসামিন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এ কারণে রান্না করা শাকসবজি দ্রুত ফ্রিজে রাখা এবং একাধিকবার গরম না করাই ভালো। শিশু, বয়স্ক ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার মানুষের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকা উচিত।

 

৬. দুধজাত খাবার ও ক্রিমযুক্ত খাবার

দুধ, পায়েস, খির, কাস্টার্ড, ক্রিমযুক্ত তরকারি বা দুধভিত্তিক খাবার খুব দ্রুত নষ্ট হতে পারে, বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায়। এগুলো দীর্ঘ সময় বাইরে রাখলে ব্যাকটেরিয়া বাড়ার ঝুঁকি থাকে। বারবার গরম করলে স্বাদ, পুষ্টিমান ও নিরাপত্তা-সবই কমে যেতে পারে। তাই এসব খাবার রান্নার পর দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখতে হবে এবং প্রয়োজনমতো অল্প অংশ গরম করে খেতে হবে।

 

নিরাপদে খাবার সংরক্ষণ ও গরম করার নিয়ম

খাবার রান্নার পর দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা যাবে না। সাধারণ নিয়ম হলো, রান্না করা খাবার ২ ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখা। গরম আবহাওয়া হলে আরও দ্রুত ফ্রিজে রাখা নিরাপদ। ভাত, মাংস, ডিম, দুধজাত খাবার ও শাকসবজি ছোট পাত্রে ভাগ করে রাখলে দ্রুত ঠান্ডা হয়। খাবার গরম করার সময় পুরো খাবার সমানভাবে গরম হয়েছে কি না দেখতে হবে।

 

ভাত ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বারবার গরম না করাই ভালো। একবার গরম করলে যতটুকু খাবেন ততটুকুই গরম করুন। খাবার থেকে দুর্গন্ধ, টক স্বাদ, ফাঙ্গাস, পিচ্ছিল ভাব বা অস্বাভাবিক রং দেখা গেলে তা ফেলে দিন।

 

লিভার সুস্থ রাখতে কী করবেন

লিভারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস। কম তেল, কম চিনি, কম প্রক্রিয়াজাত খাবার, পর্যাপ্ত সবজি-ফল, নিরাপদ পানি, নিয়মিত ব্যায়াম ও ওজন নিয়ন্ত্রণ লিভারকে সুরক্ষিত রাখে। অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, হেপাটাইটিস বি টিকা নেওয়া, হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা করা এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি। আইএআরসি অ্যালকোহলকে লিভার ক্যান্সারের নিশ্চিত ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বারবার গরম করা খাবার নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর দরকার নেই, কিন্তু অবহেলা করারও সুযোগ নেই। সব খাবার আবার গরম করলেই ক্যান্সার হবে-এমন দাবি সঠিক নয়। তবে বারবার গরম করা তেল, ভুলভাবে সংরক্ষিত ভাত, অতিরিক্ত পোড়া আলু বা স্টার্চজাত খাবার, দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা ডিম-মাংস ও দুধজাত খাবার-এসব নিয়মিত খেলে খাদ্যবিষক্রিয়া, পেটের সমস্যা, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ