দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে কি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়?

দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে কি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়?
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

অফিসে আট ঘণ্টা কাজের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে অনেক কর্মীকে নিয়মিত এর চেয়েও বেশি সময় কাজ করতে হয়। কখনো কাজের চাপ, কখনো প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা, আবার কখনো জীবিকার প্রয়োজনে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা অনেকের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু অতিরিক্ত সময় কাজ করার এই অভ্যাস শুধু ক্লান্তি বা মানসিক চাপেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্ট্রোক, হৃদরোগ, ঘুমের সমস্যা, ডিপ্রেশন, দুর্ঘটনা এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় কাজের কারণে ২০১৬ সালে বিশ্বে স্ট্রোক ও ইসকেমিক হৃদরোগে ৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গবেষণাটিকে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও কর্মসংক্রান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রথম বৈশ্বিক বিশ্লেষণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করলে সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজকারীদের তুলনায় স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ এবং ইসকেমিক হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ বেড়ে যায়।

 

জাপানে অতিরিক্ত কাজ করতে করতে মৃত্যুর জন্য আলাদা একটি শব্দও আছে-‘কারোশি’। এর অর্থ, অতিরিক্ত পরিশ্রমে মৃত্যু। জাপান সরকার ২০১৭ সালে কারোশিতে ২৩৬ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিল। এই বাস্তবতা দেখায়, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এখন শুধু ব্যক্তিগত জীবনযাপনের সমস্যা নয়; বরং এটি শ্রমনীতি, স্বাস্থ্যনীতি ও কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত একটি বড় বৈশ্বিক সংকট।

 

দীর্ঘ সময় কাজের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি কোথায়

ডব্লিউএইচও-আইএলওর গবেষণায় বলা হয়েছে, দীর্ঘ কর্মঘণ্টার স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানুষ। অর্থাৎ বাংলাদেশের মতো দেশের কর্মীদের জন্যও এই বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় কাজের কারণে যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই মধ্যবয়সী বা বয়স্ক পুরুষ। অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত কাজের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায় না; বরং বছর কিংবা দশক পরে স্ট্রোক, হৃদরোগ বা অন্যান্য জটিলতায় তা প্রকাশ পায়।

 

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে কর্মরত ১৮০ কোটি মানুষের মধ্যে ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ সপ্তাহে ৪৯ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাজ করেন। এই সংখ্যা দেখায়, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; বরং কোটি কোটি মানুষের কর্মজীবনের বাস্তবতা।

 

হার্ট অ্যাটাকের পর বদলে যায় জীবনদর্শন

দীর্ঘ কর্মঘণ্টার বিপদ বোঝাতে ব্রিটেনের ব্যাংক কর্মকর্তা জনাথন ফ্রস্টিকের অভিজ্ঞতা আলোচনায় আসে। ৪৫ বছর বয়সী এই কর্মকর্তা একদিন কাজের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় হঠাৎ বুকের ব্যথা, গলা-চোয়াল ও হাতে ব্যথা এবং শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন। পরে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি হার্ট অ্যাটাকের মুখোমুখি হয়েছিলেন।

 

সুস্থ হওয়ার পর তিনি নিজের কাজের ধরন বদলে ফেলেন। লিঙ্কডইনে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, তিনি আর সারাদিন জুমে বসে থাকবেন না। তার এই পোস্ট অনেক মানুষের মধ্যে আলোড়ন তোলে। অনেকেই নিজেদের অতিরিক্ত কাজ, মানসিক চাপ এবং শারীরিক ক্ষতির অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।

 

জনাথন নিজের দীর্ঘ কর্মঘণ্টার জন্য সরাসরি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেননি। তবে তার পোস্টে একজন মন্তব্য করেন, কোম্পানিগুলো অনেক সময় কর্মীদের ব্যক্তিগত সুস্থতার কথা না ভেবে সীমার বাইরে ঠেলে দেয়। পরে তার কর্মস্থলও দ্রুত সুস্থতা কামনা করে এবং কর্মীদের নিজেদের সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানায়।

 

মহামারির পর কাজের সময় আরও বেড়েছে

করোনা মহামারির পর ঘরে বসে কাজ, অনলাইন মিটিং, সবসময় অনলাইনে থাকার চাপ এবং অফিস-ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেকের কাজের সময় বেড়েছে। ডব্লিউএইচওর টেকনিক্যাল অফিসার ফ্র্যাঙ্ক পেগা বলেছেন, কোনো দেশে লকডাউন হলে কাজের সময় প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়-এমন কিছু প্রমাণ তাদের হাতে আছে।

 

দীর্ঘ সময় কাজ এখন মোট কাজ-সংক্রান্ত রোগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এটিকে একটি বড় পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। অতিরিক্ত কাজ শুধু শারীরিক অসুস্থতা নয়, মানসিক চাপ, অবসাদ, বার্নআউট এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ায়।

 

শরীর ও মনের ওপর কীভাবে আঘাত করে

গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় কাজ শরীরের ক্ষতি করে মূলত দুইভাবে। প্রথমত, অতিরিক্ত চাপ সরাসরি শরীর ও মনের ওপর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস মানসিক অবসাদ, বিরক্তি, ঘুমের সমস্যা, শরীর ব্যথা ও ক্লান্তি তৈরি করতে পারে। মনোযোগ কমে গেলে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।

 

দ্বিতীয়ত, বেশি সময় কাজ করলে মানুষ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন থেকে দূরে সরে যায়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে ঘুম কমে, ব্যায়াম কম হয়, অনেকে ধূমপান বা মদ্যপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে, আবার দ্রুত খাবার বা অস্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। ল্যানসেটসহ বিভিন্ন গবেষণায় দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সঙ্গে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, পেশির সমস্যা এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ডব্লিউএইচও-আইএলওর বিশ্লেষণও দীর্ঘ কর্মঘণ্টাকে ইসকেমিক হৃদরোগ ও স্ট্রোকের বড় ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করেছে।

 

বাংলাদেশি কর্মীদের অভিজ্ঞতাও একই বাস্তবতা দেখায়

ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাহাত হোসেন জানান, তার আগের চাকরিতে সপ্তাহে ৬০ থেকে ৬৫ ঘণ্টা কাজ করা ছিল স্বাভাবিক বিষয়। অনেক সময় টানা কয়েক সপ্তাহ বাড়ির বাইরে থাকতে হতো। দীর্ঘদিনের চাপ তার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। তার ভাষায়, কাজের চাপ নিতে নিতে তিনি ডিপ্রেশনের দিকে যাচ্ছিলেন। সবসময় মেজাজ খিটখিটে থাকত, কাজ শেষে শরীর-মন ভেঙে পড়ত। চার বছর পর তিনি সেই চাকরি ছাড়েন।

 

বাংলাদেশের অনেক খাতেই দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এখন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বেসরকারি চাকরি, গণমাধ্যম, হাসপাতাল, নিরাপত্তা সেবা, পোশাকশিল্প, পরিবহন খাত, আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং-বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মীরা নিয়মিত অতিরিক্ত সময় কাজ করেন। অনেক সময় এই অতিরিক্ত কাজের বিনিময়ে যথাযথ বিশ্রাম, ওভারটাইম বা মানসিক সহায়তা পাওয়া যায় না।

 

গিগ ইকোনমিতে কাজের সময়ের সীমা নেই

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক গিগ ইকোনমি কর্মী যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের ক্লায়েন্টদের জন্য রাতের পর রাত কাজ করেন। ফ্রিল্যান্স প্ল্যাটফর্মে কোডিং, ব্লগ লেখা, ওয়েবসাইট তৈরি, ডিজিটাল মার্কেটিং, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবস্থাপনা বা গ্রাফিক ডিজাইনের মতো কাজ করতে গিয়ে অনেকের কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

 

ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের আইটি বিভাগে কাজ করেন সাজ্জাদ তানজিদ। ভিন্ন টাইম জোনের কারণে তার অফিস শুরু হয় বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় এবং শেষ হয় সকাল ৭টায়। কখনো সেটি সকাল ৮টা বা ৯টা পর্যন্ত গড়ায়। তিনি জানান, এভাবে রাতের পর রাত জাগার কারণে তার ঘুমে সমস্যা হচ্ছে, সারাদিন ক্লান্ত লাগে, কোথাও যেতে পারেন না, জরুরি ফোন কলও ধরতে পারেন না। তবু কাজের ধরন এমন যে সময় বদলানোর সুযোগ নেই।

 

অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের অ্যালেক্স জে উডের নেতৃত্বে করা গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম কর্মীদের অতিরিক্ত কাজের দিকে ঠেলে দেয়। ভালো র‍্যাংকিং, ভালো রিভিউ এবং ভবিষ্যতের কাজ পাওয়ার জন্য কর্মীদের ক্লায়েন্টের প্রায় সব দাবি মেনে চলতে হয়। কম সময়ের ডেডলাইন, যেকোনো সময় যোগাযোগের চাপ এবং কম পারিশ্রমিকে বেশি কাজ-সব মিলিয়ে গিগ কর্মীরা দীর্ঘ কর্মঘণ্টার চক্রে আটকে পড়েন।

 

ঘুমই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়

গবেষক অ্যালেক্স জে উডের মতে, দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে ঘুমের ওপর। কম ঘুম আবার কাজের সক্ষমতা কমায়, মনোযোগ নষ্ট করে, ভুল বাড়ায় এবং মানসিক চাপ আরও বাড়ায়। এভাবে কম ঘুম ও দীর্ঘ সময় কাজ এক ধরনের দুষ্টচক্র তৈরি করে। একইভাবে কাজের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ না থাকা, বস বা সহকর্মীদের সহায়তার অভাব, হঠাৎ দায়িত্ব বদলে যাওয়া, অফিসে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং প্রতিষ্ঠানগত অনিশ্চয়তাও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও মানসিক চাপ বাড়ায়।

‘অন কল’ থাকা মানেও মানসিক বিশ্রাম না পাওয়া

 

আগে অফিস থেকে বের হওয়া মানেই অনেকের কাছে কাজ শেষ ছিল। কিন্তু এখন স্মার্টফোন, ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ, স্ল্যাক, জুম ও অনলাইন টুলের কারণে কাজ অফিসের বাইরে গিয়েও কর্মীকে অনুসরণ করে। অনেক কর্মী সরাসরি কাজ না করলেও অফিসের মেসেজের উত্তর দেন, টিমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, কাজ সম্পর্কিত পডকাস্ট শোনেন বা নতুন দক্ষতা অর্জনে সময় দেন।

 

২০০৬ সালে বার্লিনের গবেষক ইয়ান টাওয়ার্সের এক গবেষণাপত্রে বলা হয়, মোবাইল প্রযুক্তি আসার পর থেকে ম্যানেজার ও সহকর্মীরা কর্মীদের সবসময় কাজের জন্য প্রস্তুত থাকার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু ‘অন কল’ থাকা মানে কাজ থেকে মুক্ত থাকা নয়। ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, অন কল থাকা মানুষের কোর্টিসল হরমোনের মাত্রা সকালে দ্রুত বেড়ে যায়, এমনকি তারা সেদিন কাজ না করলেও চাপের প্রভাব থাকে।

 

কোর্টিসল শরীরের স্ট্রেস-সম্পর্কিত হরমোন। সাধারণত ঘুম থেকে ওঠার পর এটি বাড়ে এবং দিনের সঙ্গে সঙ্গে কমে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী চাপ এই হরমোনের স্বাভাবিক চক্রকে নষ্ট করতে পারে। ফলে অন কল থাকা কর্মীরা মানসিকভাবে কখনোই কাজ থেকে আলাদা হতে পারেন না। এতে বিশ্রামের সময়ও পুরোপুরি বিশ্রাম থাকে না।

 

ক্লান্তিকে অর্জন মনে করা বিপজ্জনক

উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তার ৪৭তম জন্মদিন কেটেছিল কারখানায় সারারাত কাজ করে। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, একসময় সপ্তাহে ১২০ ঘণ্টা কাজ করাও তার জন্য স্বাভাবিক ছিল। তার কিছু ভক্ত বড় অর্জনের জন্য এমন ত্যাগকে স্বাভাবিক মনে করেন, বিশেষ করে সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপ সংস্কৃতিতে।

 

কিন্তু গবেষকরা বলছেন, ক্লান্তিকে গর্বের বিষয় হিসেবে দেখানো বিপজ্জনক। দিন-রাত কাজ করা, ছুটির দিনেও কাজ করা কিংবা বিশ্রাম না নেওয়াকে যদি সাফল্যের শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়, তাহলে তা কর্মীদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সংস্কৃতি তৈরি করে। দীর্ঘ সময় কাজের উদ্দেশ্যই অনেক সময় ব্যর্থ হয়ে যায়, কারণ অতিরিক্ত কাজ উৎপাদনশীলতা কমায়, ভুল বাড়ায় এবং মানুষকে অসুস্থ করে তোলে।

 

যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ বছরের চাকরির তথ্য বিশ্লেষণ করে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব চাকরিতে ওভারটাইম রয়েছে, সেখানে কর্মক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি ওভারটাইম নেই এমন চাকরির তুলনায় ৬১ শতাংশ বেশি। যদিও গবেষণাটি সরাসরি ক্লান্তিকে একমাত্র কারণ বলেনি, তবে দীর্ঘ সময় জেগে কাজ করলে কর্মক্ষমতা যে দ্রুত কমে যায়, তা বহু গবেষণাতেই উঠে এসেছে।

 

টানা ১৭ ঘণ্টা জেগে কাজ করলে শরীরের প্রতিক্রিয়া ও সমন্বয় এমনভাবে খারাপ হতে পারে, যা মদ্যপ অবস্থার সঙ্গে তুলনীয়। কম্পিউটারে টাইপ করার ক্ষেত্রে বিষয়টি ততটা চোখে না পড়লেও গাড়ি চালানো, যন্ত্রপাতি পরিচালনা, চিকিৎসা, নির্মাণকাজ বা উচ্চ মনোযোগের কাজে এটি বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

 

পরিবহন খাতেও দীর্ঘ কর্মঘণ্টার ঝুঁকি

বাংলাদেশে বাস ও ট্রাকচালকদের দীর্ঘ সময় কাজ করা, বেশি ভাড়ার লোভে অতিরিক্ত ট্রিপ নেওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়। নিয়মিতভাবে চালকদের কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কম দেখা যায়। ক্লান্ত চালক সড়কে শুধু নিজের নয়, যাত্রী ও পথচারীর জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলেন।

 

চার দিনের কর্মসপ্তাহ কি সমাধান হতে পারে

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মঘণ্টা কমানো কর্মীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি বড় গবেষণায় দেখা যায়, বেতন না কমিয়ে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করলে কর্মীদের বার্নআউট কমে, কাজের সন্তুষ্টি বাড়ে, মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা উন্নত হয় এবং কর্মক্ষমতাও ভালো হতে পারে। গবেষণায় ঘুমের সমস্যা কমা, ক্লান্তি কমা এবং কাজের সক্ষমতা বাড়াকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বড় চার দিনের কর্মসপ্তাহ পরীক্ষার ফলেও দেখা গেছে, সপ্তাহে একদিন কম কাজ করলে উৎপাদনশীলতা কমেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে কর্মীদের বার্নআউট কমেছে এবং সুস্থতা বেড়েছে।

 

এ ছাড়া ২০২৬ সালে ইউরোপিয়ান কংগ্রেস অন ওবেসিটিতে উপস্থাপিত এক গবেষণায় দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও স্থূলতার সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়। সেখানে বলা হয়, দীর্ঘ সময় কাজ করলে মানুষ ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার প্রস্তুত ও বিশ্রামের সময় কম পায়। কাজের চাপ ও সময়ের সংকট ওজন বাড়ার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

 

কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের কী করা উচিত

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানা দিনরাত কাজ করা বা একাধিক দিন পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া কাজ চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত কাজ করা যেতে পারে, কিন্তু তা যেন নিয়মে পরিণত না হয়। অতিরিক্ত কাজ যদি বেশি অর্থ, পদোন্নতি বা দক্ষতা বৃদ্ধির বাস্তব সুযোগ তৈরি করে, তবুও সীমা বজায় রাখা জরুরি।

 

নতুন চাকরিজীবী মালিহা নূর জানান, অফিসের বাইরে কাজ সম্পর্কিত ব্লগ পড়া, পডকাস্ট দেখা, ইংরেজি ও উচ্চারণ শেখার মাধ্যমে তিনি নিজেকে এগিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। তার মতে, এই বাড়তি কাজ তাকে অফিসের উচ্চপদস্থদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে সাহায্য করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন অতিরিক্ত কাজ যদি আনন্দ, শেখা বা উন্নতির অংশ হয়, তাহলে তা তুলনামূলক ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু যদি তা বাধ্যতামূলক প্রত্যাশায় পরিণত হয়, তাহলে মানসিক চাপ বাড়ে।

 

টরন্টোর একটি আন্তর্জাতিক মার্কেটিং প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মীর উদাহরণও দেখায়, ছুটিতে থাকলেও অনেকে কাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে পারেন না। সরাসরি কাজ না করলেও টিমের হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা দেখা, কাজ সম্পর্কিত কনটেন্ট শোনা বা সিদ্ধান্তে যুক্ত থাকা আসলে কাজেরই অংশ। ধীরে ধীরে এগুলো যদি কর্মক্ষেত্রের প্রত্যাশা হয়ে যায়, তাহলে পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

 

স্বাস্থ্য আগে, কাজ পরে

ডব্লিউএইচও বলছে, কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে নিয়োগদাতাদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। ফ্র্যাঙ্ক পেগার মতে, কাজের সময় সীমিত করা নিয়োগদাতাদের জন্যও ভালো, কারণ এতে উৎপাদনশীলতা বাড়ে। অর্থনৈতিক সংকটের সময় কাজের ঘণ্টা বাড়ানো বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এখন বৈশ্বিকভাবে কর্মীদের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে।

 

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘ সময় কাজকে দক্ষতা বা নিষ্ঠার প্রমাণ হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে এর মূল্য অনেক বড় হতে পারে। স্ট্রোক, হৃদরোগ, ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ, ডিপ্রেশন, দুর্ঘটনা এবং উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া-সবই দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সঙ্গে যুক্ত। তাই কর্মী, প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের এখন কাজের সময়, বিশ্রাম, মানসিক স্বাস্থ্য এবং কর্মজীবনের ভারসাম্যকে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।

 

কাজ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; কিন্তু কাজের জন্য জীবন ও স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনো টেকসই সমাধান নয়। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, উৎপাদনশীলতার আসল ভিত্তি হলো সুস্থ কর্মী-ক্লান্ত, ঘুমহীন ও বার্নআউটে ভোগা মানুষ নয়।

 

সূত্র: বিবিসি বাংলা


সম্পর্কিত নিউজ