পুষ্টিগুণে ভরপুর হলেও সবার জন্য নিরাপদ নয় পেঁপে, যেসব রোগে বাড়তে পারে ঝুঁকি

পুষ্টিগুণে ভরপুর হলেও সবার জন্য নিরাপদ নয় পেঁপে, যেসব রোগে বাড়তে পারে ঝুঁকি
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

পেঁপে বাংলাদেশের অত্যন্ত পরিচিত ও সহজলভ্য একটি ফল। কাঁচা ও পাকা-দুইভাবেই খাওয়া যায় এই ফল। পুষ্টিবিদদের মতে, পেঁপেতে রয়েছে ভিটামিন এ, সি, ই, ফাইবার, ফলেট, ম্যাগনেশিয়াম এবং পাপেইন নামের বিশেষ এনজাইম, যা হজমশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। নিয়মিত পরিমিত পেঁপে খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, ত্বক ভালো থাকে এবং হজমজনিত নানা সমস্যাও কমে।

তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকারী হলেও পেঁপে সবার জন্য সমান নিরাপদ নয়। কিছু বিশেষ শারীরিক অবস্থা বা রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি উল্টো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত পরিমাণে বা ভুল সময়ে পেঁপে খেলে জটিলতা দেখা দিতে পারে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা, চিকিৎসক মতামত এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এমন সতর্কতার কথাই উঠে এসেছে।

 

ল্যাটেক্স অ্যালার্জি থাকলে বাড়তে পারে বিপদ

চিকিৎসকদের মতে, পেঁপেতে থাকা কিছু প্রোটিনের গঠন প্রাকৃতিক ল্যাটেক্সের সঙ্গে মিল রয়েছে। ফলে যাদের ল্যাটেক্স অ্যালার্জি আছে, তাদের শরীরে পেঁপে খাওয়ার পর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এতে চুলকানি, ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি, নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি কিংবা গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টও হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, একে “ল্যাটেক্স-ফ্রুট সিনড্রোম” বলা হয়। রাবারের গ্লাভস, বেলুন বা ল্যাটেক্সজাতীয় জিনিসে যাদের অ্যালার্জি রয়েছে, তাদের পেঁপে খাওয়ার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

 

অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমবার পেঁপে খাওয়ার পর যদি শরীরে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

 

গর্ভাবস্থায় কাঁচা পেঁপে কেন ঝুঁকিপূর্ণ?

গর্ভবতী নারীদের জন্য কাঁচা বা আধাপাকা পেঁপে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে বহুদিন ধরেই চিকিৎসকরা সতর্ক করে আসছেন। কাঁচা পেঁপেতে থাকা ল্যাটেক্স ও পাপেইন গর্ভাশয়ে সংকোচন তৈরি করতে পারে, যা গর্ভপাত বা অকাল প্রসবের ঝুঁকি বাড়ায়।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকা পেঁপে তুলনামূলক নিরাপদ হলেও গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া ঠিক নয়। কারণ গর্ভাবস্থায় শরীরের হরমোন ও হজমপ্রক্রিয়ায় নানা পরিবর্তন আসে। এ সময় যেকোনো খাবার গ্রহণের আগে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।

 

স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় গ্রামীণ এলাকায় গর্ভাবস্থায় কাঁচা পেঁপে দিয়ে তৈরি খাবার খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, যা ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই গর্ভবতী নারীদের খাদ্যতালিকা নির্ধারণে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে কী সমস্যা হতে পারে?

পেঁপেতে থাকা কিছু বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান হৃদস্পন্দনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। বিশেষ করে যারা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা হার্ট অ্যারিথমিয়া সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য অতিরিক্ত পেঁপে খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

 

কার্ডিওলজিস্টদের মতে, পেঁপেতে থাকা পটাশিয়াম সাধারণ মানুষের জন্য উপকারী হলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এটি ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যারা উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের ওষুধ খান, তাদের খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত পটাশিয়াম সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এর মানে এই নয় যে হৃদরোগীরা একেবারেই পেঁপে খেতে পারবেন না। বরং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

 

থাইরয়েড সমস্যায় সতর্কতা

হাইপোথাইরয়েডিজম–এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও পেঁপে নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, পেঁপের কিছু উপাদান থাইরয়েড হরমোনের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। যাদের থাইরয়েড হরমোন স্বাভাবিকের তুলনায় কম কাজ করে, তাদের ক্ষেত্রে বিপাকক্রিয়া আরও ধীর হয়ে যেতে পারে। এর ফলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, ওজন বৃদ্ধি, চুল পড়া বা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ বাড়তে পারে।

 

এন্ডোক্রাইন বিশেষজ্ঞদের মতে, থাইরয়েড রোগীরা খাদ্যতালিকায় যেকোনো পরিবর্তন আনার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ অনেক সময় স্বাস্থ্যকর খাবারও নির্দিষ্ট রোগে ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

 

কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি যাদের

পেঁপেতে প্রচুর ভিটামিন সি রয়েছে। যদিও এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তবে অতিরিক্ত ভিটামিন সি শরীরে অক্সালেটে রূপ নিতে পারে। এই অক্সালেট কিডনিতে জমে পাথর তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যাদের আগে কিডনিতে পাথর হয়েছে বা পারিবারিকভাবে ঝুঁকি রয়েছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত পেঁপে খাওয়া সমস্যার কারণ হতে পারে।

 

নেফ্রোলজিস্টরা বলছেন, কিডনি রোগীদের শুধু পেঁপে নয়, ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ সব খাবারই পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। পর্যাপ্ত পানি পান এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস কিডনি সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কি উপকারী?

পুষ্টিবিদদের মতে, পাকা পেঁপেতে প্রাকৃতিক চিনি থাকলেও এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তুলনামূলক কম। ফলে পরিমিত পরিমাণে খেলে এটি অনেক ডায়াবেটিস রোগীর জন্য নিরাপদ হতে পারে। তবে অতিরিক্ত খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়াবেটিস রোগীদের ফল খাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পেঁপে নয়, যেকোনো ফল অতিরিক্ত খেলেই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে পারে।

 

শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে কী সতর্কতা প্রয়োজন?

চিকিৎসকদের মতে, ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পেঁপে খেলে পাতলা পায়খানা বা পেটের অস্বস্তি হতে পারে। কারণ এতে থাকা ফাইবার ও এনজাইম হজমে প্রভাব ফেলে। একইভাবে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত পেঁপে খেলে গ্যাস্ট্রিক বা পেট খারাপের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বয়স ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিমিত পরিমাণে পেঁপে খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন পুষ্টিবিদরা।

 

পরিমিত খাবারই সবচেয়ে নিরাপদ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেঁপে অত্যন্ত উপকারী একটি ফল হলেও যেকোনো খাবারের মতো এটিও পরিমিত পরিমাণে খাওয়া জরুরি। সুস্থ মানুষের জন্য পেঁপে সাধারণত নিরাপদ এবং উপকারী। তবে যাদের দীর্ঘমেয়াদি রোগ, অ্যালার্জি বা বিশেষ শারীরিক অবস্থা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত।

 

চিকিৎসকদের ভাষায়, “স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই সবার জন্য সমান নিরাপদ নয়।” তাই শরীরের অবস্থা বুঝে এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে পেঁপে খাওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়।


সম্পর্কিত নিউজ