বেশি পানি পান করেও কেন কাটছে না পানিশূন্যতা?

বেশি পানি পান করেও কেন কাটছে না পানিশূন্যতা?
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

তীব্র গরমে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বেশি পানি পান করে। কিন্তু অনেকের অভিজ্ঞতা হলো, সারাদিন বারবার পানি খাওয়ার পরও শরীর চাঙা লাগে না, ক্লান্তি কাটে না, কখনও মাথা হালকা ঘোরে, আবার কারও পায়ে টান ধরে। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এর একটি বড় কারণ হতে পারে শুধু পানির ঘাটতি নয়, ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। অর্থাৎ গরমে শরীর থেকে যে ঘাম বের হয়, তাতে শুধু পানি নয়-সোডিয়াম, ক্লোরাইড, পটাসিয়ামসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজও কমে যেতে পারে।

ইলেকট্রোলাইট আসলে কী

ইলেকট্রোলাইট হলো এমন কিছু খনিজ, যেগুলো পানিতে দ্রবীভূত হলে বৈদ্যুতিক চার্জ বহন করে এবং শরীরের বহু জরুরি কাজে অংশ নেয়। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের ভাষায়, এগুলো শরীরে রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, কোষের ভেতর-বাইরের তরলের ভারসাম্য, স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদান এবং পেশির কাজ সচল রাখতে সাহায্য করে। সোডিয়াম তরলের মাত্রা ও স্নায়ু-পেশির কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ, পটাসিয়াম হৃদযন্ত্র, স্নায়ু ও পেশিতে ভূমিকা রাখে, আর ক্লোরাইড শরীরের তরল ও রক্তের ভারসাম্যে কাজ করে। সহজভাবে বললে, পানি শরীরে তরল জোগায়, আর ইলেকট্রোলাইট সেই তরলকে সঠিক জায়গায়, সঠিক অনুপাতে, সঠিক কাজে ব্যবহার করতে সাহায্য করে।

 

কেন শুধু পানি সবসময় যথেষ্ট হয় না

ঘাম শরীরের স্বাভাবিক ঠান্ডা হওয়ার প্রক্রিয়া। কিন্তু ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক বলছে, ঘাম প্রধানত পানি হলেও এতে অল্প পরিমাণ সোডিয়াম, ক্লোরাইড এবং আরও কিছু উপাদান থাকে। তাই দীর্ঘসময় রোদে থাকা, ভারী শারীরিক পরিশ্রম করা, অসুস্থতায় জ্বর আসা, বা ব্যায়ামে বেশি ঘাম হলে শরীর থেকে শুধু পানি নয়, ইলেকট্রোলাইটও বেরিয়ে যায়।

 

এখানেই সমস্যার শুরু। যদি কেউ শুধু পানি পান করেন, কিন্তু শরীরের হারানো ইলেকট্রোলাইট না ফেরান, তাহলে তৃষ্ণা কিছুটা মিটলেও শরীরের ভেতরের ভারসাম্য পুরোপুরি ঠিক নাও হতে পারে। ক্লান্তি, ঝিমঝিম ভাব, মাথা ঘোরা, পেশিতে টান, দুর্বলতা-এসব তখন দেখা দিতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক সরাসরি বলছে, ডিহাইড্রেশন অনেক সময় ইলেকট্রোলাইট ক্ষয়ের সঙ্গেও যুক্ত থাকে, আর তখন পেশিতে ক্র্যাম্প, মাথাব্যথা, ব্রেন ফগ বা ঝাপসা ভাব এবং সার্বিকভাবে খারাপ লাগা দেখা দিতে পারে।

 

ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতার লক্ষণ কী

এনএইচএস ও মায়ো ক্লিনিক-দুই সূত্রেই প্রাপ্তবয়স্কদের ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ হিসেবে তৃষ্ণা, গা ম্যাজম্যাজে ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, কম প্রস্রাব হওয়া, গাঢ় রঙের প্রস্রাব, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, এমনকি বিভ্রান্তি পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। মায়ো ক্লিনিক বলছে, মৃদু পানিশূন্যতাও শক্তি কমিয়ে দিতে পারে এবং চিন্তা পরিষ্কার রাখতে সমস্যা করতে পারে। গরমের দিনে যারা নিয়মিত বাইরে থাকেন, মাঠে কাজ করেন, দীর্ঘসময় যাতায়াত করেন, বা ব্যায়াম করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো আরও দ্রুত দেখা দিতে পারে।

 

গরমে সবচেয়ে ঝুঁকিতে কারা

সবাই গরমে অসুস্থ হতে পারেন, তবে কিছু মানুষ তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী, কিডনি বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, জ্বর বা ডায়রিয়ায় ভোগা মানুষ, এবং যারা খুব বেশি ঘামেন-তাদের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতা ও ইলেকট্রোলাইট ঘাটতির ঝুঁকি বেশি। এনএইচএস গরম আবহাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বা ডায়রিয়ার সময় বাড়তি তরল নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

 

শরীর ঠান্ডা রাখা আর শরীর চালু রাখা-দুইটি এক নয়

অনেকে মনে করেন, বেশি পানি খেলেই সমস্যা শেষ। কিন্তু শরীরের তাপমাত্রা সামলানো আর কোষ, পেশি, স্নায়ু ও রক্তপ্রবাহকে স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে রাখা-এই দুইটি একই বিষয় নয়। পানি জরুরি, কিন্তু শরীরের তরল ভারসাম্য ঠিক রাখতে সোডিয়াম-পটাসিয়ামের মতো খনিজও জরুরি। মায়ো ক্লিনিক স্পষ্টভাবে বলছে, ডিহাইড্রেশন চিকিৎসার মূল কথা হলো হারানো fluid and electrolytes-দুটিই পূরণ করা।

 

ইলেকট্রোলাইটের অভাবে কী কী সমস্যা হতে পারে

ইলেকট্রোলাইট কমে গেলে শরীরে নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • পেশিতে টান ধরা বা ক্র্যাম্প
  • দুর্বল লাগা
  • মাথা ঝিমঝিম করা
  • মাথাব্যথা
  • বমি বমি ভাব
  • দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া
  • অতিরিক্ত তৃষ্ণা
  • হালকা বিভ্রান্তি বা মনোযোগ কমে যাওয়া

ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্যে বলা হয়েছে, সোডিয়াম তরল নিয়ন্ত্রণ করে, পটাসিয়াম পেশি ও হৃদযন্ত্রের কাজের জন্য দরকার, আর ভারসাম্য নষ্ট হলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।

 

কখন পানি যথেষ্ট, আর কখন ইলেকট্রোলাইট দরকার

সব পরিস্থিতিতে ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক দরকার হয় না। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের মতে, কম বা মাঝারি মাত্রার কার্যকলাপ-যেমন এক ঘণ্টা বা তার কম হাঁটা-এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ পানি যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘসময় রোদে থাকা, কয়েক ঘণ্টা বাইরে কাজ করা, বেশি ঘাম হওয়া, বা দীর্ঘসময় ব্যায়াম করলে ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ তরলের প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ, হালকা তৃষ্ণায় শুধু পানি ঠিক আছে, কিন্তু প্রচুর ঘাম, দুর্বলতা বা অসুস্থতার ক্ষেত্রে শুধু পানি নয়, ইলেকট্রোলাইটও ভাবতে হবে।

 

সমাধান কী হতে পারে


১. ওআরএস

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ওরাল রিহাইড্রেশন সল্টস বা ORS হলো গ্লুকোজ-ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ একটি কার্যকর ও সাশ্রয়ী সমাধান, যা শরীরের পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে। বিশেষ করে ডায়রিয়া, বমি বা ডিহাইড্রেশনের ক্ষেত্রে ORS বহু বছর ধরেই বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

গরমে অতিরিক্ত ঘাম হলে, বিশেষ করে দুর্বলতা বা মাথা ঘোরা থাকলে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ORS কাজে আসতে পারে।

 

২. ডাবের পানি

ডাবের পানিতে প্রাকৃতিকভাবে কিছু ইলেকট্রোলাইট থাকে, বিশেষ করে পটাসিয়াম। তাই গরমে এটি একটি জনপ্রিয় প্রাকৃতিক বিকল্প। যদিও সবসময় ORS-এর বদলি নয়, তবু হালকা ক্লান্তি বা ঘামের পর এটি উপকারী হতে পারে।

 

৩. লবণ-চিনির ঘরোয়া শরবত

স্বল্পমাত্রার লবণ, পানি ও চিনি মিশিয়ে ঘরোয়া সল্যুশন তৈরি করা যায়। তবে অনুপাত ঠিক রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ভুল অনুপাতে অতিরিক্ত লবণ বা চিনি দিলে উপকারের বদলে ক্ষতি হতে পারে। তাই সম্ভব হলে বাজারজাত ORS বা চিকিৎসকের পরামর্শমতো সমাধানই ভালো।

 

৪. খাবার থেকেও ইলেকট্রোলাইট

কলা, দই, ডাবের পানি, স্যুপ, ফল, শাকসবজি-এসব থেকেও কিছু ইলেকট্রোলাইট পাওয়া যায়। শুধু পানি নয়, খাবারের মাধ্যমেও শরীরকে সাপোর্ট দিতে হয়।

 

কী কী ভুল না করাই ভালো

গরমে অনেকেই একসঙ্গে খুব বেশি পানি খেয়ে ফেলেন, কিন্তু তাতেও সবসময় লাভ হয় না। আবার অনেকে সফট ড্রিংক, এনার্জি ড্রিংক বা অতিরিক্ত চিনি-যুক্ত পানীয়কে সমাধান ভাবেন। মায়ো ক্লিনিক কমিউনিটি হেলথের একটি সাম্প্রতিক ফিচারে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত চিনি-যুক্ত পানীয়, সোডা বা এনার্জি ড্রিংক সবসময় ভালো পছন্দ নয়; এগুলো ওজন বাড়াতে ও প্রদাহ বাড়াতে পারে। অ্যালকোহলও গরমে ভালো বিকল্প নয়, কারণ এটি পানিশূন্যতা বাড়াতে পারে। এনএইচএস তৃষ্ণা বা ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকিতে অ্যালকোহল ও অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়।

কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে

যদি কারও-

  • তীব্র দুর্বলতা হয়
  • দাঁড়িয়ে মাথা ঘোরে
  • প্রস্রাব খুব কমে যায়
  • বমি বা ডায়রিয়ার সঙ্গে পানি রাখতে না পারে
  • বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস দেখা দেয়


তাহলে দেরি না করে চিকিৎসা নিতে হবে। মায়ো ক্লিনিক বলছে, ডিহাইড্রেশন গুরুতর হলে তা দ্রুত চিকিৎসার বিষয়।

 

গরমে সুস্থ থাকার বাস্তব কৌশল

গরমে সুস্থ থাকতে শুধু “বারবার পানি পান করুন” বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং বাস্তব কৌশল হতে পারে:

  • তৃষ্ণা লাগার আগেই নিয়মিত পানি পান করা
  • প্রস্রাবের রং হালকা আছে কি না খেয়াল করা
  • অতিরিক্ত ঘাম হলে ইলেকট্রোলাইটের কথাও ভাবা
  • দীর্ঘসময় রোদে থাকলে ORS বা উপযুক্ত রিহাইড্রেশন ড্রিংক রাখা
  • ডাবের পানি বা হালকা লবণ-লেবুর শরবত নেওয়া
  • অতিরিক্ত চিনি, অ্যালকোহল ও ভারী ডিহাইড্রেটিং পানীয় কমানো
  • গরমে বাইরে কাজ বা ব্যায়ামের সময় বিরতি নেওয়া


গরমে শরীরের যত্ন মানে শুধু তৃষ্ণা মেটানো নয়। কারণ শরীর ঘামের সঙ্গে পানি যেমন হারায়, তেমনি হারায় জরুরি খনিজও। তাই সারাদিন শুধু পানি খেয়েও যদি ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা না কমে, তবে বিষয়টি “পানি কম খাওয়া”র চেয়েও বেশি কিছু হতে পারে। সেখানেই আসে ইলেকট্রোলাইটের প্রসঙ্গ।


সম্পর্কিত নিউজ