নতুন আতঙ্ক হান্টা ভাইরাস, কীভাবে ছড়ায় ও কতটা ভয়ংকর

নতুন আতঙ্ক হান্টা ভাইরাস, কীভাবে ছড়ায় ও কতটা ভয়ংকর
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

আটলান্টিক মহাসাগরে চলাচলকারী একটি প্রমোদতরিতে হান্টা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা করা ডাচ পতাকাবাহী ‘এমভি হোন্ডিয়াস’ নামের ওই জাহাজে একজন যাত্রীর শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে এবং আরও কয়েকজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

জাহাজটিতে প্রায় ২৮টি দেশের ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করায় সম্ভাব্য সংক্রমণ শনাক্তে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় পরিসরে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন, সুইজারল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ কয়েকটি দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখন সম্ভাব্য সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণে রেখেছে।

 

ডব্লিউএইচওর সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মারিয়া ভ্যান কারকোহভ জানিয়েছেন, পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হলেও সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার মতো অবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এটি কোভিড-১৯ বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো দ্রুত ছড়ানো ভাইরাস নয় এবং এটিকে নতুন কোনো মহামারির সূচনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে না। তবে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের কাজ চলছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটিতে এ পর্যন্ত অন্তত ৮ থেকে ১১টি নিশ্চিত বা সন্দেহভাজন সংক্রমণের ঘটনা পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে একটি ডাচ দম্পতি ও এক জার্মান নাগরিক মারা গেছেন। আরও কয়েকজনকে আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

 

বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে ‘আন্দেস ভাইরাস’ নামের একটি বিরল স্ট্রেইন শনাক্ত হওয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি হান্টা ভাইরাসের একমাত্র ধরন, যা সীমিত আকারে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে সক্ষম। ডব্লিউএইচও ধারণা করছে, জাহাজে থাকা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা কয়েকজন যাত্রীর মধ্যে মানবদেহ থেকে মানবদেহে সংক্রমণ ঘটতে পারে।

 

এ পরিস্থিতিতে ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল (ইসিডিসি) সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে জাহাজের সব যাত্রীকে ‘উচ্চ ঝুঁকির সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করেছে। অনেক দেশই আক্রান্ত বা সম্ভাব্য আক্রান্ত যাত্রীদের বিশেষ ব্যবস্থায় নিজ দেশে ফিরিয়ে নিচ্ছে এবং ৪২ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে রাখছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসিও জানিয়েছে, দেশটিতে জনস্বাস্থ্যের জন্য সামগ্রিক ঝুঁকি এখনো খুব কম। তবে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে শতাধিক কর্মকর্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কাজ করছেন। কয়েকজন যাত্রীকে নেব্রাস্কা ও আটলান্টার বিশেষ বায়োসেফটি ইউনিটে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

 

হান্টা ভাইরাস কী?

হান্টা ভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীবাহিত এক ধরনের ভাইরাস। মানুষ সাধারণত আক্রান্ত ইঁদুরের লালা, মল-মূত্র বা শুকিয়ে যাওয়া বর্জ্যের ধূলিকণার সংস্পর্শে এলে সংক্রমিত হতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে ইঁদুরের কামড় বা আঁচড় থেকেও এটি ছড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। তবে আন্দেস ভাইরাস নামের বিশেষ স্ট্রেইনের ক্ষেত্রে সীমিত মানব-সংক্রমণের নজির অতীতে দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া গেছে।

 

এটি কী ধরনের রোগ সৃষ্টি করে?

হান্টা ভাইরাস প্রধানত দুই ধরনের রোগ সৃষ্টি করে-

 

১. হান্টা ভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (এইচপিএস)

এটি ফুসফুসে আক্রমণ করে। প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, শরীর ব্যথা, তীব্র ক্লান্তি, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব এবং শ্বাসকষ্ট। শ্বাসকষ্ট শুরু হলে রোগটি দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে এবং এতে মৃত্যুহার প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

 

২. হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম (এইচএফআরএস)

এটি কিডনিকে আক্রান্ত করে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে নিম্ন রক্তচাপ, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, কিডনি জটিলতা ও তীব্র দুর্বলতা।

 

পরিসংখ্যান কী বলছে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় দেড় লাখ মানুষ এইচএফআরএসে আক্রান্ত হন, যার বড় অংশই এশিয়ায়। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৮৯০টি হান্টা ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে।

চিকিৎসা ও সতর্কতা হান্টা ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক বা অনুমোদিত ওষুধ এখনো নেই। চিকিৎসকেরা সাধারণত অক্সিজেন থেরাপি, আইসিইউ সাপোর্ট, ভেন্টিলেশন, ডায়ালাইসিস ও উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো-

  • ঘরবাড়িতে ইঁদুরের উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা
  • ইঁদুর ঢোকার সম্ভাব্য পথ বন্ধ রাখা
  • খাবার খোলা অবস্থায় না রাখা
  • ইঁদুরের মল পরিষ্কারের সময় মাস্ক ব্যবহার করা
  • ঘর পরিষ্কারের আগে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে পরিস্থিতি সীমিত পরিসরের মধ্যেই রয়েছে। তাই অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

তথ্যসূত্র: বিবিসি


সম্পর্কিত নিউজ