দেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার, আক্রান্ত ৫০ হাজার ছাড়াল

দেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার, আক্রান্ত ৫০ হাজার ছাড়াল
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

দেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সারা দেশে হামের ‘সন্দেহজনক’ রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৫৬৭ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ৭ হাজার ২৪ জনের শরীরে হাম সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে।

একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৪২৫ জন। তাদের মধ্যে অন্তত ৬৮ জনের শরীরে হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছিল। আক্রান্ত ও মৃতদের বেশিরভাগই শিশু হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দেড় দশকে বাংলাদেশে হামের এমন ভয়াবহ বিস্তার আর দেখা যায়নি। সংক্রমণ ও মৃত্যুর বর্তমান চিত্রকে তারা ‘জনস্বাস্থ্য সংকট’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

 

গত এপ্রিলে জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপ বা ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (নাইট্যাগ)-এর সভায় বিশেষজ্ঞরা একমত হন যে, প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিতে হামের উপসর্গ নিয়ে হওয়া মৃত্যুকেও হামে মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সেই হিসাব ধরলে এবার দেশের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

 

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর সাবেক প্রধান ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘মাত্র দুই মাসের কম সময়ের মধ্যে এত সংক্রমণ সত্যিই মারাত্মক। আমাদের জনসংখ্যার অনুপাতে হিসাব করলেও এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।’

 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা যথাযথভাবে না দিতে পারার জন্যই হামে এত সংক্রমণ ও মৃত্যু। তবে মৃত্যুর দায় বর্তমান সরকারকেও নিতে হবে।
অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ, জনস্বাস্থ্যবিদ

 

আড়াই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সংক্রমণ

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত আড়াই দশকে দেশে কখনো হামের রোগী ৫০ হাজার ছাড়ায়নি। এর আগে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০০৫ সালে, তখন আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এরপর কয়েক বছর ধরে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। এমনকি ২০২৫ সালে মাত্র ১৩২ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল। তার আগের পাঁচ বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ ও ২৪৭ জন।

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে হাম নির্মূলের পথে অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকেই হঠাৎ সংক্রমণ বাড়তে থাকে এবং একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনা সামনে আসে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত বছর পর্যাপ্ত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত না হওয়াই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম বড় কারণ। পাশাপাশি শিশুদের অপুষ্টি এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার বিষয়টিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

 

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর দ্রুত স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করে চিকিৎসা জোরদার করা গেলে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কমানো সম্ভব হতো।

 

প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৫ মার্চ থেকে নিয়মিত হাম পরিস্থিতির তথ্য প্রকাশ করছে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ৯ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে তিনজনের হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছিল। এই একই সময়ে আরও ১ হাজার ১০৫ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে এবং নতুন করে ৮৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ২৪ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত করা হয়েছে।

সবশেষ এক সপ্তাহেই মারা গেছেন ৪৯ জন। জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, দেশে গত এক দশকে এক সপ্তাহে হামে এত মৃত্যুর ঘটনা আর ঘটেনি। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, চিকিৎসাব্যবস্থার যথাযথ বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্তরভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে শিশুমৃত্যুর বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো।

 

বিশ্বের মাত্র কয়েকটি দেশের কাতারে বাংলাদেশ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বিশ্বে খুব কম দেশেই বছরে ৫০ হাজারের বেশি হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। সেই তালিকায় এবার বাংলাদেশের নামও যুক্ত হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত দেড় দশকে ভারত, ইউক্রেন, মাদাগাস্কার এবং কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে একাধিকবার বড় আকারে হাম ছড়িয়ে পড়েছিল।

 

ভারতে ২০২৩ সালে হাম রোগীর সংখ্যা ছিল ৬৫ হাজার ১৫০ জন। ইউক্রেনে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ৫০ হাজারের বেশি আক্রান্ত শনাক্ত হয়। মাদাগাস্কারে ২০১৯ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ১৩ হাজার ছাড়িয়ে যায়। আর যুদ্ধবিধ্বস্ত কঙ্গোতে গত ১০ বছরে সাতবার ৫০ হাজারের বেশি রোগী পাওয়া গেছে।

 

ঢাকায় কর্মরত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর এক কর্মকর্তা জানান, কঙ্গোতে যুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতার কারণে দেশটির বড় অংশ টিকাদানের বাইরে থাকায় সেখানে সংক্রমণ ভয়াবহ আকার নিয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বাংলাদেশে টিকাদান কার্যক্রম দ্রুত জোরদার করা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ