যৌনবাহিত রোগ সিফিলিস: চিকিৎসা না নিলে হতে পারে প্রাণঘাতী ঝুঁকি

যৌনবাহিত রোগ সিফিলিস: চিকিৎসা না নিলে হতে পারে প্রাণঘাতী ঝুঁকি
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

যৌনবাহিত সংক্রমণগুলোর মধ্যে সিফিলিস অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি রোগ। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে এটি শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জটিলতা তৈরি করতে পারে।

দীর্ঘদিন চিকিৎসাহীন থাকলে রোগটি মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, চোখ, কান, হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালীতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে আশার বিষয় হলো, সঠিক সময়ে পরীক্ষা ও অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা নিলে সিফিলিস সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বা সিডিসি।

 

সিফিলিস আসলে কী

সিফিলিস হলো একটি যৌনবাহিত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ। ট্রেপোনেমা প্যালিডাম নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে এ রোগ হয়। সাধারণত সংক্রমিত ব্যক্তির সঙ্গে অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে থাকা সিফিলিসের ঘা বা ক্ষতের সরাসরি সংস্পর্শে এলে সংক্রমণ অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করতে পারে। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, রোগটি ধাপে ধাপে অগ্রসর হয় এবং প্রতিটি পর্যায়ে উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে।

 

প্রথম পর্যায়ে ব্যথাহীন ঘা দেখা দিতে পারে

সিফিলিসের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত সংক্রমিত স্থানে ছোট, গোলাকার ও ব্যথাহীন ঘা দেখা দেয়। এই ঘা যৌনাঙ্গ, মুখ, ঠোঁট, মলদ্বার বা শরীরের অন্য সংক্রমিত স্থানে হতে পারে। অনেক সময় ঘাটি ব্যথাহীন হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি তা গুরুত্ব দেন না, এমনকি অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তিনি সিফিলিসে আক্রান্ত হয়েছেন। ঘা নিজে নিজে শুকিয়ে গেলেও রোগ সেরে যায় না; বরং সংক্রমণ শরীরের ভেতরে থেকে যায় এবং পরবর্তী পর্যায়ে অগ্রসর হতে পারে।

 

দ্বিতীয় পর্যায়ে র‍্যাশ, জ্বর ও ক্লান্তি

প্রাথমিক পর্যায়ের পর সিফিলিস সেকেন্ডারি পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। এ সময় শরীরে র‍্যাশ বা দানা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে হাতের তালু ও পায়ের পাতায় র‍্যাশ দেখা দেওয়ার ঘটনা বেশি আলোচিত। এর সঙ্গে জ্বর, গলা ব্যথা, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, ক্লান্তি, লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া বা চুল পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, এসব উপসর্গ কিছুদিন পর কমে যেতে পারে, কিন্তু চিকিৎসা না নিলে সংক্রমণ শেষ হয়ে যায় না।

 

লুকানো পর্যায়ে উপসর্গ না থাকলেও ঝুঁকি থাকে

চিকিৎসা না নিলে সিফিলিস ল্যাটেন্ট বা লুকানো পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এই পর্যায়ে রোগীর শরীরে দৃশ্যমান কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। ফলে অনেকেই মনে করেন তিনি সুস্থ হয়ে গেছেন। কিন্তু বাস্তবে সংক্রমণ শরীরের ভেতরে সক্রিয় থাকতে পারে। এই পর্যায় মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছরও থাকতে পারে। চিকিৎসা না হলে পরবর্তী সময়ে রোগটি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

 

শেষ পর্যায়ে বড় অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ক্ষতি

সিফিলিস দীর্ঘদিন অবহেলায় থাকলে টারশিয়ারি পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এই পর্যায়ে রোগটি হৃদ্‌যন্ত্র, রক্তনালী, মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, চোখ, হাড়, পেশি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। সিডিসি জানিয়েছে, চিকিৎসাহীন সিফিলিস মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে ছড়ালে নিউরোসিফিলিস, চোখে ছড়ালে অকুলার সিফিলিস এবং কানে ছড়ালে অটোসিফিলিস হতে পারে। এতে তীব্র মাথাব্যথা, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, স্মৃতিভ্রংশ, চলাফেরায় সমস্যা, এমনকি প্রাণঘাতী জটিলতাও তৈরি হতে পারে।

 

কীভাবে সংক্রমণ ছড়ায়

সিফিলিস মূলত সংক্রমিত ব্যক্তির সঙ্গে অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমিত ঘা বা ক্ষতের সরাসরি সংস্পর্শে এলে ব্যাকটেরিয়া অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করতে পারে। শুধু যৌনাঙ্গের সংস্পর্শ নয়, মুখ বা মলদ্বারসংক্রান্ত যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটতে পারে।

এ ছাড়া গর্ভবতী মা আক্রান্ত হলে গর্ভের শিশুর শরীরেও সিফিলিস ছড়াতে পারে। এটি জন্মগত সিফিলিস নামে পরিচিত। তবে টয়লেট সিট, দরজার হাতল, কাপড়-চোপড়, খাবারের পাত্র, সুইমিং পুল বা দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসের মাধ্যমে সিফিলিস ছড়ায় না বলে স্বাস্থ্যসংস্থাগুলো জানিয়েছে।

 

কারা বেশি ঝুঁকিতে

যৌন সম্পর্কে সক্রিয় যে কেউ সিফিলিসে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে যাদের একাধিক যৌনসঙ্গী রয়েছে, যারা নিয়মিত কনডম ব্যবহার করেন না, যারা যৌনবাহিত রোগের পরীক্ষা করান না অথবা যাদের সঙ্গীর সংক্রমণের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। সিফিলিস থাকলে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে, কারণ শরীরে ঘা থাকলে ভাইরাস প্রবেশের পথ সহজ হয়। তাই যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং নিরাপদ যৌন আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

গর্ভবতীদের জন্য বাড়তি সতর্কতা

গর্ভাবস্থায় সিফিলিস থাকলে তা মা ও শিশুর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, চিকিৎসাহীন সিফিলিস গর্ভাবস্থায় থাকলে মৃত শিশু জন্ম, নবজাতকের মৃত্যু, অকাল প্রসব, কম ওজনের শিশু জন্ম এবং শিশুর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে। সিডিসি জানিয়েছে, গর্ভাবস্থায় সিফিলিস মায়ের শরীর থেকে শিশুর শরীরে যেতে পারে এবং এটি প্রতিরোধযোগ্য হলেও চিকিৎসা না নিলে মারাত্মক পরিণতি তৈরি করতে পারে।

তাই গর্ভবতী নারীদের অন্তত একবার সিফিলিস পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। মায়ো ক্লিনিকও বলছে, গর্ভাবস্থার প্রথম প্রি-নাটাল চেকআপে সিফিলিস পরীক্ষা করা জরুরি। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী একাধিকবার পরীক্ষা করা লাগতে পারে।

 

চিকিৎসায় সম্পূর্ণ ভালো হওয়া সম্ভব

সিফিলিস ভয়াবহ জটিলতা তৈরি করতে পারলেও সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে এটি নিরাময়যোগ্য। সিডিসি ও মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক, সেকেন্ডারি বা প্রাথমিক ল্যাটেন্ট সিফিলিসের ক্ষেত্রে সাধারণত পেনিসিলিন ইনজেকশন কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘদিনের সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অতিরিক্ত ডোজ বা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। গর্ভবতী নারীদের সিফিলিস চিকিৎসায় পেনিসিলিনই সুপারিশকৃত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত।

তবে নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া বা অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়। রোগের ধাপ, পরীক্ষার ফল, গর্ভাবস্থা, অ্যালার্জি বা অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক চিকিৎসা নির্ধারণ করেন। চিকিৎসা নেওয়ার পরও পুনরায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই চিকিৎসা শেষে ফলোআপ পরীক্ষা, যৌনসঙ্গীর পরীক্ষা ও চিকিৎসা এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।

 

প্রতিরোধে সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি

বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌনবাহিত রোগ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকার নিশ্চিত উপায় হলো ঝুঁকিপূর্ণ যৌন সম্পর্ক এড়িয়ে চলা। তবে যারা যৌনভাবে সক্রিয়, তাদের ক্ষেত্রে নিরাপদ যৌন আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত কনডম ব্যবহার, একাধিক যৌনসঙ্গী এড়িয়ে চলা, সঙ্গীর যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে জানা, নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া-এসব ব্যবস্থা সিফিলিসসহ যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে পারে।

সিফিলিস নিয়ে সামাজিক লজ্জা, ভয় বা গোপনীয়তার কারণে অনেকেই পরীক্ষা করাতে দেরি করেন। এতে রোগ জটিল হয়ে ওঠে এবং অন্যদের মধ্যেও ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যৌনস্বাস্থ্যও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অংশ। তাই উপসর্গ থাকলে বা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কের ইতিহাস থাকলে লজ্জা না পেয়ে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

 

সতর্কতার বার্তা

সিফিলিস এমন একটি সংক্রমণ, যা শুরুতে নীরব বা সামান্য উপসর্গ দিয়ে শুরু হলেও চিকিৎসা না করলে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ব্যথাহীন ঘা, অস্বাভাবিক র‍্যাশ, জ্বর, গলা ব্যথা, চোখ বা কানে সমস্যা, বা ঝুঁকিপূর্ণ যৌন সম্পর্কের ইতিহাস থাকলে দ্রুত পরীক্ষা করা জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা নিলে রোগটি পুরোপুরি ভালো করা সম্ভব; কিন্তু অবহেলা করলে এর পরিণতি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা, জন্মগত সংক্রমণ, এমনকি মৃত্যু।


সম্পর্কিত নিউজ