জিলহজের প্রথম ১০ দিনের ১০ গুরুত্বপূর্ণ আমল

জিলহজের প্রথম ১০ দিনের ১০ গুরুত্বপূর্ণ আমল
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ সময়। এই দিনগুলো এমন এক মহামূল্যবান সুযোগ, যখন বান্দার নেক আমল আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় হয়ে ওঠে। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি আত্মশুদ্ধি, তাওবা, তাকওয়া, দান-সদকা, জিকির, রোজা, হজ, কোরবানি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বিশেষ মৌসুম।

একজন মুমিনের জন্য এ দশক শুধু ক্যালেন্ডারের কিছু দিন নয়; বরং এটি ঈমানকে নবায়ন করার, পাপ থেকে ফিরে আসার এবং আখিরাতমুখী জীবনের প্রস্তুতি নেওয়ার এক অনন্য সুযোগ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ যেদিন আসমান জমিন সৃষ্টি করেছেন সেদিন থেকেই মাসসমূহের গণনা আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁর বিধান অনুযায়ী বারটি। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)

 

হাদিসে মহানবী (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় সময়ের হিসাব যথাস্থানে ফিরে এসেছে, আসমান-জমিনের সৃষ্টির সময় যেমন ছিল (কারণ, আরবরা মাস-বছরের হিসাব কম-বেশি ও আগপিছ করে ফেলেছিল); বারো মাসে এক বছর। এর মধ্য থেকে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি মাস ধারাবাহিক-জিলকদ, জিলহজ, মুহাররম। আরেকটি হলো রজব, যা জুমাদাল আখিরাহ ও শাবানের মধ্যবর্তী মাস। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৪৬৬২)

 

এই চার সম্মানিত মাসের মধ্যে জিলহজ মাসের বিশেষত্ব আরও বেশি। কারণ এ মাসেই ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত হজ পালন করা হয় এবং আদায় করা হয় কোরবানির মতো মহান আমল। বিশেষ করে জিলহজের প্রথম দশককে আল্লাহ তাআলা নিজেই মর্যাদা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘শপথ ফজরের, শপথ দশ রাত্রির। ’ (সুরা : ফাজর, আয়াত : ১-২)

 

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ও মুজাহিদ রাহ.-সহ অনেক সাহাবী, তাবেঈ ও মুফাসসির বলেন, এখানে ‘দশ রাত’ বলে জিলহজ্বের প্রথম দশ রাতকে বুঝানো হয়েছে। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা-৫৩৫)

 

এ সময়ের আমলের মর্যাদা সম্পর্কে সহিহ বুখারিতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জিলহজের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে উত্তম আমল আর কোনো দিনে নেই; সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করেন, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়? তিনি বলেন, জিহাদও নয়; তবে যে ব্যক্তি নিজের জান-মাল নিয়ে বের হয়ে আর কিছুই ফিরে আনেনি-তার কথা ভিন্ন।

 

এ কারণে আলেমরা বলেন, এই দিনগুলোতে ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল আমল, তাওবা, ইস্তিগফার, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা-সব নেক কাজের প্রতি বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত। নিচে জিলহজের প্রথম দশকের গুরুত্বপূর্ণ ১০টি আমল তুলে ধরা হলো। মূল লেখায় উল্লেখিত হাদিস ও আরবি অংশ অপরিবর্তিত রেখে বিষয়গুলো আরও ব্যাখ্যাসহ সাজানো হয়েছে।

 

১. বেশি বেশি জিকির ও তাসবিহ পাঠ করা

জিকির ও তাসবিহ আল্লাহ তাআলার কাছে অনেক প্রিয় আমল। জিলহজের প্রথম দশকে বেশি বেশি তাকবির, তাহলিল, তাহমিদ ও তাসবিহ পড়া সুন্নাহসম্মত একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। একজন মুমিন যখন আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করে, তখন তার অন্তরে দুনিয়ার মোহ কমে এবং রবের প্রতি বিনয় ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।

 

এ দশকের আমল হিসেবে বিশেষভাবে জিকিরের কথা এসেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলার নিকট জিলহজের প্রথম দশকের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সুতরাং তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার এবং আলহামদু লিল্লাহ পড়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৫৪৪৬)

 

আলেমদের মতে, এ দিনগুলোতে ঘরে, পথে, বাজারে, মসজিদে ও ব্যক্তিগত সময়ে বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা উচিত। বিশেষ করে ‘আল্লাহু আকবার’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আলহামদু লিল্লাহ’ ও ‘সুবহানাল্লাহ’ পাঠের মাধ্যমে অন্তরকে আল্লাহমুখী রাখা যায়।

 

২. জিলহজ শুরু হলে নখ-চুল না কাটা

ইহরাম বাঁধার পর হাজিদের জন্য নখ-চুল কাটাসহ আরও কিছু বিষয় নিষেধ। যারা হজে যাননি, তাদের জন্য ইহরামের বিধান প্রযোজ্য নয়; তবে যারা কোরবানির নিয়ত করেছেন, তাদের জন্য জিলহজ মাস শুরু হওয়ার পর থেকে কোরবানি করা পর্যন্ত চুল-নখ না কাটার নির্দেশ হাদিসে এসেছে। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায়ও কোরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির জন্য এ নির্দেশ উল্লেখ আছে।

 

হাদিসে বিশেষ মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে। উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যখন জিলহজের প্রথম দশক শুরু হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কুরবানি করবে সে যেন তার চুল নখ না কাটে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯৭৭)

 

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে কোরবানির দিন ঈদ (পালনের) আদেশ করা হয়েছে, যা আল্লাহ এ উম্মতের জন্য নির্ধারিত করেছেন। তখন এক সাহাবি আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! যদি আমার কাছে শুধু একটি মানিহা থাকে (অর্থাৎ যা শুধু দুধপানের জন্য কাউকে দেওয়া হয়েছে) আমি কি তা কোরবানি করব? মহানবী (সা.) বললেন, না, তবে তুমি (জিলহজের প্রথম দশক শুরু হওয়ার পর চুল-নখ ইত্যাদি না কেটে কোরবানির দিন) চুল, নখ ও মোঁচ কাটবে এবং নাভীর নিচের পশম পরিষ্কার করবে। এটাই আল্লাহর দরবারে তোমার পূর্ণ কুরবানী বলে গণ্য হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৭৮৯)

 

তবে এ বিধান মূলত কোরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো ব্যক্তি যদি ভুলে বা অজ্ঞতাবশত চুল-নখ কেটে ফেলেন, তবে তাওবা করবেন এবং কোরবানি যথাসময়েই আদায় করবেন।

 

৩. জিলহজের প্রথম নয় দিন রোজা রাখা

জিলহজের প্রথম দশক নেক আমলের বিশেষ সময়। তবে দশম দিন ঈদুল আজহা হওয়ায় সে দিন রোজা রাখা জায়েজ নয়। তাই আলেমরা জিলহজের প্রথম নয় দিন রোজা রাখাকে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল বলেছেন। রোজা এমন এক ইবাদত, যার প্রতিদান আল্লাহ নিজ হাতে দেবেন-এ কথা হাদিসে এসেছে। তাই সামর্থ্য থাকলে এ দিনগুলোতে রোজা রাখা মুমিনের জন্য বড় সৌভাগ্যের বিষয়।

 

ফোকাহায়ে কেরাম জিলহজের প্রথম নয় দিন রোজা রাখা উত্তম বলেছেন। কারও পক্ষে সম্ভব হলে সে পুরো নয় দিনই রোজা রাখবে। কারণ, জিলহজের পুরো দশকের আমলই আল্লাহর কাছে প্রিয়। এ দশককে আমলে প্রাণবন্ত রাখার জন্য রোজার বিকল্প কোনো আমল নেই। কারণ, রোজা আল্লাহর কাছে অত্যধিক প্রিয় আমল। তাই যাদের পক্ষে সম্ভব জিলহজের প্রথম দশক তথা নয় জিলহজ পর্যন্ত রোজা রাখতে রাখা। হাদিস এসেছে, ‘মহানবী (সা.) জিলহজের নয় দিন রোজা রাখতেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৪৩৭)

 

সুনানে আবু দাউদের বর্ণনায়ও এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) জিলহজের প্রথম নয় দিন, আশুরার দিন এবং প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখতেন।

 

৪. বিশেষভাবে নয় জিলহজ রোজা রাখা

যাদের পক্ষে প্রথম নয় দিন রোজা রাখা সম্ভব নয়, তাদের জন্য অন্তত আরাফার দিন অর্থাৎ ৯ জিলহজ রোজা রাখার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এটি হাজি ছাড়া অন্য মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। হাজিরা আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন, তাই তাদের জন্য সে দিন রোজা না রাখাই উত্তম-যাতে তারা ইবাদত ও দোয়ায় শক্তি পান।

 

কারো পক্ষে যদি পুরো নয় দিনই রোজা রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে সে নয় জিলহজ রোজা রাখবে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘আরাফার দিনের (নয় জিলহজের) রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করি যে, (এর দ্বারা) আগের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)

 

এ হাদিসে আরাফার রোজার মাধ্যমে দুই বছরের গুনাহ মাফের আশা ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে আলেমরা বলেন, এখানে সাধারণত ছোট গুনাহের মাফ বোঝানো হয়েছে; বড় গুনাহের জন্য অবশ্যই আন্তরিক তাওবা প্রয়োজন।

 

৫. জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা

আরাফার দিন আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বিশেষ দিন। এ দিন বান্দা বেশি বেশি তাওবা করবে, নিজের গুনাহের জন্য কান্নাকাটি করবে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাইবে। ইসলামের শিক্ষা হলো-মুমিন কখনো নিজের আমলের ওপর নির্ভর করে না; বরং আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও দয়ার ওপর ভরসা করে।

 

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আরাফার দিনের মত আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার নিকটবতীর্ হন এবং বান্দাদের নিয়ে ফিরিশতাদের সাথে গর্ব করেন। আল্লাহ বলেন, কী চায় তারা? (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৩৪৮)

 

এ দিনের শিক্ষা হলো-মানুষ যত পাপীই হোক, আল্লাহর রহমতের দরজা তার জন্য খোলা। তাই আরাফার দিনসহ জিলহজের প্রথম দশকে বেশি বেশি তাওবা, ইস্তিগফার ও দোয়া করা উচিত।

 

৬. দোয়া করা

দোয়া মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। বিশেষ করে আরাফার দিন দোয়ার মর্যাদা অত্যন্ত বেশি। এ দিনে বান্দা নিজের, পরিবার-পরিজন, মুসলিম উম্মাহ, দেশ, সমাজ ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুলবে। জামে তিরমিজির বর্ণনায় আরাফার দিনের দোয়াকে শ্রেষ্ঠ দোয়া বলা হয়েছে।

 

আরাফার দিন জিলহজের প্রথম দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এ দিনে দোয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। মহানবী (সা.) বলেন, ‘শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো আরাফার দোয়া। এ দিনের দোয়া হিসেবে সর্বোত্তম হল ঐ দোয়া, যা আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীরা করেছেন।’ তা হল,

لَا إِلَهَ إِلّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

(জামে তিরমিযী, হাদিস নং : ৩৫৮৫)

 

এই দোয়ার মূল শিক্ষা হলো তাওহিদ-আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই, সব রাজত্ব ও প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। তাই আরাফার দিনে এই দোয়া বেশি বেশি পড়া এবং নিজের প্রয়োজনগুলো আল্লাহর কাছে পেশ করা উত্তম।

 

৭. হজ ও ওমরাহ সম্পাদন করা

জিলহজ মাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো হজ। সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর জীবনে একবার হজ ফরজ। হজ হলো আত্মসমর্পণ, ধৈর্য, ত্যাগ, ঐক্য ও আল্লাহর আনুগত্যের এক অনন্য ইবাদত। আর ওমরাহও এমন ইবাদত, যা গুনাহ মাফের মাধ্যম হিসেবে হাদিসে উল্লেখ হয়েছে।

 

হজ ও ওমরাহ এ দুটি হলো এ দশকের সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এক ওমরাহ থেকে আরেক ওমরাহ মধ্যবর্তী গুনাহের কাফফারাস্বরূপ আর কবুল হজের প্রতিদান কেবলই জান্নাত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৭৭৩, মুসলিম, হাদিস : ৩৩৫৫)

 

যারা হজে যেতে পারেননি, তারাও এ দিনগুলোতে হাজিদের মতো ইবাদতের আবহ তৈরি করতে পারেন-রোজা, জিকির, তাকবির, দান-সদকা, কোরআন তিলাওয়াত ও কোরবানির প্রস্তুতির মাধ্যমে।

 

৮. তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা

জিলহজের বিশেষ আমলগুলোর মধ্যে তাকবিরে তাশরিক অন্যতম। এটি ঈদুল আজহার সময় মুসলিম সমাজে আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তাকবিরের মাধ্যমে বান্দা ঘোষণা করে-আল্লাহ সবচেয়ে মহান, তাঁর ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁরই জন্য।

 

জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজরের নামাজ থেকে নিয়ে ১৩ তারিখের আসরের নামাজ পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব। নারী-পুরুষ সবার জন্য ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা কর্তব্য। (ফাতাওয়ায়ে শামি)

 

এ তাকবির একবার করে পাঠ করবে। তাকবিরে তাশরিক হলো, ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’

 

হানাফি ফিকহের আলোচনায়ও ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত তাকবিরে তাশরিক পাঠের কথা উল্লেখ করা হয়েছে; হজরত উমর, হজরত আলী ও হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর আমল থেকেও এই তাকবিরের শব্দ বর্ণিত হয়েছে।

 

৯. পশু কোরবানি করা

কোরবানি হলো হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর ত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহপ্রেমের স্মৃতি বহনকারী মহান ইবাদত। এটি শুধু পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তু ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলার শিক্ষা। কোরবানির গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়স্বজনকে দেওয়া এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা-এতে সামাজিক সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্বের চেতনাও প্রকাশ পায়।

 

এ দিনগুলোর দশম দিন প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব।

 

কোরবানির ক্ষেত্রে নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা জরুরি। লোকদেখানো, প্রতিযোগিতা বা সামাজিক মর্যাদা প্রকাশের জন্য নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোরবানি করতে হবে। কোরআনের শিক্ষা হলো-আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছে না; পৌঁছে বান্দার তাকওয়া।

 

১০. ঈদুল আজহার নামাজ পড়া

ঈদুল আজহার নামাজ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, আনন্দ ও ইবাদতের প্রকাশ। এ নামাজের মাধ্যমে মুসলিমরা আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করে, কোরবানির প্রস্তুতি নেয় এবং সম্মিলিতভাবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। ঈদের দিন পরিচ্ছন্নতা, সুন্নাহসম্মত পোশাক, তাকবির পাঠ, নামাজে অংশগ্রহণ এবং মানুষের সঙ্গে সদাচরণ-সবই ঈমানি সৌন্দর্যের অংশ।

 

ঈদুল আজহার নামাজ প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন পুরুষের ওপর ওয়াজিব। সূর্যোদয়ের ২০-৩০ মিনিট পর থেকে দ্বিপ্রহরের পূর্ব পর্যন্ত ঈদের নামাজ পড়া যায়। নবীজি (সা.) ঈদুল আজহার নামাজ সাধারণত সূর্যোদয়ের আধাঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে আদায় করতেন। ঈদুল আজহার নামাজ একটু তাড়াতাড়ি পড়াই উত্তম। তবে প্রয়োজনে কিছুটা বিলম্ব করাও নিষিদ্ধ নয়। ঈদের নামাজের পর কোরবানি আদায় করা হয়। তাই ঈদুল আজহার দিনটি শুধু আনন্দের দিন নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ ও আনুগত্যের দিন।

 

সব মিলিয়ে জিলহজের প্রথম দশক একজন মুমিনের জীবনে আখিরাতমুখী পরিবর্তনের এক অনন্য সুযোগ। এই দিনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়-জীবনের প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে। তাই এ বরকতময় সময়কে অবহেলায় নষ্ট না করে বেশি বেশি ইবাদত, জিকির, তাওবা, দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও নেক আমলে নিজেকে ব্যস্ত রাখা উচিত। হতে পারে, এই দশকের কোনো একটি ইখলাসপূর্ণ আমলই আমাদের নাজাতের কারণ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জিলহজের প্রথম দশকের মর্যাদা অনুধাবন করে সর্বোত্তমভাবে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


সম্পর্কিত নিউজ