রুপির চাপ সামাল দিতে রুপা আমদানিতে কড়াকড়ি ভারতের

রুপির চাপ সামাল দিতে রুপা আমদানিতে কড়াকড়ি ভারতের
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং রুপির মান ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে রুপা আমদানিতে নতুন করে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ভারত। শনিবার (১৬ মে) দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড-ডিজিএফটি এক নির্দেশনায় নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের রুপা আমদানিকে ‘ফ্রি’ ক্যাটাগরি থেকে সরিয়ে ‘রেস্ট্রিকটেড’ বা সীমিত আমদানি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে এখন থেকে এসব রুপা আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি বা লাইসেন্স লাগবে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্যতম বড় রুপা ব্যবহারকারী ও আমদানিকারক ভারত প্রায় সব ধরনের রুপা আমদানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। দেশটি রুপির ওপর চাপ কমাতে এবং আমদানি বিল নিয়ন্ত্রণে রাখতে এ পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত রুপা আমদানিতে রেকর্ড ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা আগের অর্থবছরের ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক বেশি।

 

ডিজিএফটির নির্দেশনা অনুযায়ী, ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বা তার বেশি বিশুদ্ধতার রুপার বার এবং ‘বার-অন্যান্য’ শ্রেণির রুপা এখন থেকে আর অবাধে আমদানি করা যাবে না। এসব পণ্য আইটিসি এইচএস কোড ৭১০৬৯২২১ ও ৭১০৬৯২২৯-এর আওতায় পড়ে। আগে এগুলো রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার নিয়ম মেনে ‘ফ্রি’ ক্যাটাগরিতে আমদানি করা যেত। এখন এগুলো ‘রেস্ট্রিকটেড’ ক্যাটাগরিতে চলে যাওয়ায় আমদানিকারকদের আগাম অনুমতি নিতে হবে।

 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে, রুপা আমদানিতে এই বিধিনিষেধ এমন সময়ে এল, যখন কয়েক দিন আগেই ভারত সরকার স্বর্ণ ও রুপার আমদানি শুল্ক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেছে। সরকারের লক্ষ্য হলো মূল্যবান ধাতুর আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং বাড়তি আমদানি বিল কমিয়ে আনা।

 

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু শুল্ক বাড়ানো হলে আমদানি ব্যয় বাড়ে, কিন্তু আমদানি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তবে পণ্যকে ‘রেস্ট্রিকটেড’ তালিকায় নেওয়ার অর্থ হলো সরকার এখন সরাসরি আমদানির পরিমাণ ও প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ফলে রুপা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের মতো সহজে বড় আকারে রুপা আনতে দেওয়া হবে না।

 

ভারতে রুপার ব্যবহার শুধু গহনা বা মুদ্রা তৈরিতেই সীমাবদ্ধ নয়। সৌরশক্তি, ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, শিল্পকারখানা এবং বিনিয়োগ পণ্য হিসেবেও দেশটিতে রুপার বড় বাজার রয়েছে। ফলে আমদানি সীমিত হলে শিল্প খাতের কাঁচামাল সরবরাহ, গহনা খাত এবং বিনিয়োগ বাজার-সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

 

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুল্ক বাড়ানোর পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় কম শুল্কে রুপা ঢোকার সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। নতুন বিধিনিষেধকে অনেকে সেই ‘ডিউটি গ্যাপ’ বন্ধ করার পদক্ষেপ হিসেবেও দেখছেন। অর্থাৎ, সরকার শুধু আমদানি বিল কমাতেই নয়, শুল্ক ফাঁকি বা কম শুল্কের সুবিধা নিয়ে অতিরিক্ত রুপা আমদানি ঠেকাতেও ব্যবস্থা নিচ্ছে।

 

ভারত সাধারণত সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে রুপা আমদানি করে থাকে। বৈশ্বিক বাজারে ভারতের চাহিদা বড় হওয়ায় দেশটির যেকোনো আমদানি নীতি আন্তর্জাতিক রুপার বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতীয় বাজারে সরবরাহ কমে গেলে স্থানীয়ভাবে রুপার দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় আমদানি কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বল্পমেয়াদে চাহিদার চাপ কমতে পারে।

 

ব্যবসায়ীদের ধারণা, সরকার হয়তো শিল্পকারখানার প্রয়োজনীয় ব্যবহার বিবেচনায় সীমিত পরিমাণে রুপা আমদানির অনুমতি দেবে। তবে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে রুপার বার, কয়েন বা বড় আকারে মজুতের জন্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করা হতে পারে। এতে শিল্প খাতের তুলনায় বুলিয়ন বা বিনিয়োগ বাজার বেশি চাপে পড়তে পারে।

 

ভারতের এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য ও পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতাকে। ভারত জ্বালানি তেলের বড় আমদানিকারক দেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশটির আমদানি বিল দ্রুত বেড়ে যায়। একই সময়ে যদি স্বর্ণ ও রুপার মতো মূল্যবান ধাতুর আমদানিও বাড়ে, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়। এ কারণেই সরকার মূল্যবান ধাতুর আমদানি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

 

হিন্দুস্তান টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে ভারতের স্বর্ণ আমদানি ২৪ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে ৭১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে রুপা আমদানি ১৪৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেড়ে ১২ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মূল্যবান ধাতুর আমদানিতে এমন বড় উল্লম্ফন দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করেছে।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, রুপার মতো মূল্যবান ধাতুর আমদানি কমানো হলে স্বল্পমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে। এতে ডলারের চাহিদা কিছুটা কমে রুপির ওপর চাপ হ্রাস পেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে যদি শিল্প খাতে রুপার ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে এবং স্থানীয় বাজারে দামের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

 

ভারতের নতুন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারতের মূল্যবান ধাতুর বাজারে বড় পরিবর্তন এ অঞ্চলের বাণিজ্য, গহনা খাত ও বিনিয়োগ বাজারে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ভারতীয় বাজারে রুপার দাম বাড়লে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বাজারেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

 

সব মিলিয়ে রুপা আমদানিতে ভারতের এই কড়াকড়ি শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশটির মুদ্রানীতি, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বৈশ্বিক ধাতু বাজারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আমদানি শুল্ক বৃদ্ধির পর এবার অনুমতিনির্ভর আমদানি ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে ভারত সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে-অপ্রয়োজনীয় মূল্যবান ধাতু আমদানি কমিয়ে অর্থনীতির বাইরের চাপ নিয়ন্ত্রণ করাই এখন তাদের অগ্রাধিকার।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ