{{ news.section.title }}
ভারতীয় রাজনীতির প্রভাবশালী সংগঠন কট্টর হিন্দুত্তবাদী RSS, পশ্চিমা দুনিয়ায় নতুন লবিং শুরুর পেছনে উদ্দেশ্য কি?
ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও ঘৃণামূলক বক্তব্য বাড়ার অভিযোগের মধ্যেই এবার পশ্চিমা দেশগুলোতে নিজেদের ভাবমূর্তি জোরদার করতে সক্রিয় হয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, RSS। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের ভাষ্য, এটি মূলত আন্তর্জাতিক চাপ ও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার আলোচনার মুখে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ প্রচেষ্টা।
RSS ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠন। ১৯২৫ সালে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে চিকিৎসক কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার এটি প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির পূর্ণ নাম Rashtriya Swayamsevak Sangh, যার অর্থ জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক সংঘ। RSS নিজেদের ‘হিন্দুকেন্দ্রিক সভ্যতামূলক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন’ হিসেবে পরিচয় দিলেও সমালোচকরা একে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রধান আদর্শিক উৎস বলে মনে করেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, RSS শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ম্যাগাজিন, প্রকাশনা ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরে কাজ করে। একই সঙ্গে সংগঠনটি হিন্দুত্ব মতাদর্শ প্রচার করে, যার লক্ষ্য ভারতের সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ের বদলে দেশটিকে হিন্দু রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাওয়া, এমন অভিযোগ সমালোচকদের। RSS অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি, BJP-এর সঙ্গে RSS-এর ঘনিষ্ঠ আদর্শিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। BJP-কে প্রায়ই RSS-এর রাজনৈতিক শাখা বা আদর্শিক উত্তরসূরি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৯৭২ সাল থেকে RSS-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি ১৯৮৭ সালে BJP-তে যোগ দেন। ২০১৪ সালে তাঁর নেতৃত্বে BJP একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং ২০২৪ সালের জুনে মোদি তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মধ্যেই RSS সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবালে মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে বিদেশি সাংবাদিকদের বলেন, সংগঠনটি নিয়ে ‘ভুল ধারণা ও বিভ্রান্তি’ দূর করতেই তিনি পশ্চিমা দেশগুলোতে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর ভাষ্য, RSS-কে ‘আধাসামরিক সংগঠন’, ‘হিন্দু আধিপত্যবাদী’ এবং সংখ্যালঘুদের ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ বানানোর অভিযোগে তুলে ধরা হয়, তবে বাস্তবতা ভিন্ন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে হোসাবালে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি সফর করেন। যুক্তরাজ্যে তিনি লন্ডন ও রাগবিতে ছয় দিন অবস্থান করেন। সেখানে চ্যাথাম হাউসসহ বিভিন্ন নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। RSS ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্যদের সঙ্গে একটি নৈশভোজও হয়, যেখানে কনজারভেটিভ, লেবার ও লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ১০ দিন ধরে বিভিন্ন শহরে ভারতীয় আমেরিকান সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক রক্ষণশীল থিংকট্যাংক Hudson Institute-এর সঙ্গেও তাঁর আলোচনা হয়। পরে দুই দিনের সফরে জার্মানিতে গিয়ে তিনি নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ভারতীয় কমিউনিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর মধ্যে German Institute for International and Security Affairs এবং Konrad Adenauer Foundation-এর মতো প্রতিষ্ঠানও ছিল।
এই সফরের পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের Commission on International Religious Freedom, USCIRF-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টকে। ওই প্রতিবেদনে RSS-এর বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ তোলা হয়। এর পরই সংগঠনটির বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ নিয়ে আলোচনা বাড়ে।
US-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা India Hate Lab-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে মুসলিম ও খ্রিস্টানসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য ১৩ শতাংশ বেড়েছে। খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে ঘৃণামূলক বক্তব্যের ঘটনা ২০২৪ সালের ১১৫টি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১৬২টিতে দাঁড়িয়েছে, যা ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি। এসব ঘটনার বড় অংশ BJP-শাসিত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, RSS এখন আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের নিয়ে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ধারণা পাল্টাতে চাইছে। বিশেষ করে প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে সংগঠনটির দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে RSS-এর বৈশ্বিক যোগাযোগ, অর্থায়ন ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই পশ্চিমা নীতিনির্ধারক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো হচ্ছে।
তবে RSS তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছে। সংগঠনটির দাবি, তাদের লক্ষ্য ভারতীয় সমাজকে সাংস্কৃতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করা। অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মী ও গবেষকদের দাবি, ভারতে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য, হামলা, বুলডোজার অভিযান, বৈষম্যমূলক আইন এবং ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘুদের প্রান্তিক করার অভিযোগ আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে RSS-এর পশ্চিমমুখী তৎপরতা শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগ নয়, বরং বৈশ্বিক ভাবমূর্তি রক্ষার বড় রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।