হরমুজ ‘উন্মুক্ত’ রাখা ভারতের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: মোদি

হরমুজ ‘উন্মুক্ত’ রাখা ভারতের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: মোদি
ছবির ক্যাপশান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মোদির বৈঠক | ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা, ইরান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সংকটের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিকে “উন্মুক্ত, নিরাপদ ও অবাধ” রাখা ভারতের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মোদির এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক রুটে তেল ও গ্যাস পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্য অস্থির হয়ে উঠেছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের অর্থনীতিতেও।

 

সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরকালে আবুধাবিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে মোদি বলেন,

“Keeping Hormuz free, open and safe is our highest priority, and in this matter adherence to international laws is essential.”

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি, এনডিটিভি, রয়টার্স ও অন্যান্য ভারতীয় গণমাধ্যমেও একই বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

 

পাঁচ দেশ সফরের শুরুতেই জ্বালানি নিরাপত্তা ইস্যু

শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের মধ্য দিয়ে ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ায় পাঁচ দেশ সফর শুরু করেন নরেন্দ্র মোদি। এই সফরে তার নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে ও ইতালি সফরেরও কথা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সফরটির অন্যতম বড় লক্ষ্য হলো- বৈশ্বিক জ্বালানি অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা।

 

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জানুয়ারিতে স্বাক্ষরিত ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পর ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক গভীর করাও এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

 

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হলো হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরকে সংযুক্ত করা এই সরু নৌপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবহন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (EIA) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের একটি বড় অংশ প্রতিদিন এই প্রণালি অতিক্রম করে।

 

ভারতের জন্য এর গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক এবং সাধারণত ভারতের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেকই হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে আসে। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই রুটে নৌ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র বলছে, ইরান কৌশলগতভাবে প্রণালিটির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং অনেক জাহাজকে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে।

 

যুদ্ধের প্রভাব: ভারতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি

মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতার সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে ভারতে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পর শুক্রবার দেশটিতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে সরকার। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেলের দাম বৃদ্ধি, রুপির ওপর চাপ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল সংকট ভারতের অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ কারণেই আবুধাবিতে মোদির আলোচনায় জ্বালানি নিরাপত্তা অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে। ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কৌশলগত তেল মজুদ বাড়ানো নিয়েও আলোচনা করেছে।

 

আবুধাবিভিত্তিক জ্বালানি কোম্পানি ADNOC-এর সঙ্গে ভারতের কৌশলগত জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। উভয় দেশ ভারতের তেল সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩০ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।

 

সামরিক জেট দিয়ে মোদির বিমানকে এসকর্ট

সংযুক্ত আরব আমিরাতে পৌঁছানোর পর নরেন্দ্র মোদির বিমানকে দেশটির আকাশসীমায় সামরিক জেট দিয়ে এসকর্ট করা হয়। এটিকে তিনি “সম্মান” হিসেবে উল্লেখ করেন। আবুধাবিতে তাকে গার্ড অব অনারও দেওয়া হয়। বৈঠকে তিনি বলেন, “আমি আমার দ্বিতীয় বাড়িতে এসেছি।” কারণ আমিরাতে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ ভারতীয় বসবাস করেন, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের কৌশলগত ভারসাম্য

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে ভারত অত্যন্ত সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে। একদিকে ভারত ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও পশ্চিমা জোটের সঙ্গেও কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করছে।

 

ভারতের সাবেক কূটনীতিক কে.সি. সিং এএফপিকে বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতি এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইরান-আমিরাত উত্তেজনা এবং জোটগত পরিবর্তন ভারতের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

 

এদিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও সম্প্রতি ব্রিকস বৈঠকে বলেন, আন্তর্জাতিক জলপথে “safe and unimpeded maritime flows” বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হরমুজ ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 

‘ডায়ালগ ও ডিপ্লোম্যাসি’তে জোর ভারতের

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে মোদি আবারও ভারতের পুরোনো অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, যুদ্ধ নয়, বরং “dialogue and diplomacy” বা সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমেই সংকট সমাধান হওয়া উচিত।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত একদিকে আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক নৌ চলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে নিজেদের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার কৌশলও স্পষ্ট করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু ভারত নয়, পুরো এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।


সম্পর্কিত নিউজ