ভারতের ঐতিহাসিক মসজিদকে মন্দির ঘোষণা

ভারতের ঐতিহাসিক মসজিদকে মন্দির ঘোষণা
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ঐতিহাসিক ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদ কমপ্লেক্স নিয়ে বহু বছরের বিতর্কে বড় ধরনের রায় দিয়েছে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছে, এই স্থানের মূল ধর্মীয় পরিচয় সরস্বতী মন্দির ও সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে এখন থেকে সেখানে শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায় পূজা-অর্চনা করতে পারবে, মুসলিমদের নামাজ আদায়ের অনুমতি থাকবে না।

শুক্রবার (১৫ মে) ইন্দোর বেঞ্চের দেওয়া এই রায়ে আদালত ২০০৩ সালে এএসআইয়ের (আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া) সেই নির্দেশ বাতিল করে দেয়, যেখানে মুসলিমদের শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে আদালত জানিয়েছে, ভোজশালা কমপ্লেক্সের সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধান আগের মতোই এএসআইয়ের অধীনেই থাকবে এবং এটি ১৯৫৮ সালের Ancient Monuments and Archaeological Sites and Remains Act অনুযায়ী সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবেই বিবেচিত হবে।

 

দীর্ঘদিন ধরেই এই স্থাপনাকে ঘিরে দুই পক্ষের ভিন্ন দাবি ছিল। হিন্দুদের মতে, রাজা ভোজের আমলে এখানে দেবী সরস্বতীর মন্দির ও সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্র ছিল। অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের দাবি, এটি কামাল মাওলা দরগা ও মসজিদ, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নামাজ আদায় হয়ে আসছে। এতদিন প্রশাসনের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মঙ্গলবার হিন্দুরা পূজা করতেন এবং প্রতি শুক্রবার মুসলিমরা নামাজ আদায় করতেন। বসন্ত পঞ্চমীতে সরস্বতী পূজারও অনুমতি ছিল। নতুন রায়ের ফলে সেই যৌথ ব্যবস্থার সমাপ্তি হলো।

 

আদালত রায়ে উল্লেখ করেছে, ঐতিহাসিক নথি, সাহিত্য এবং এএসআইয়ের বৈজ্ঞানিক জরিপে এই স্থানের সঙ্গে সরস্বতী মন্দির ও সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্রের সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে গত বছরের দীর্ঘ ৯৮ দিনের এএসআই জরিপে স্থাপনাটির ভেতরে ও আশপাশে প্রাচীন মন্দিরের স্থাপত্য নিদর্শন, খোদাই, স্তম্ভ ও ভাস্কর্যের তথ্য উঠে আসে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, হিন্দুরা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে উপাসনা করে আসছেন এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক সাহিত্যেও ভোজশালাকে সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

তবে এই রায় ঘিরে নতুন বিতর্কও তৈরি হয়েছে। মুসলিম পক্ষের অভিযোগ, বহু বছরের যৌথ ধর্মীয় চর্চাকে উপেক্ষা করে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছে, এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হবে। ইতোমধ্যে হিন্দু সংগঠনগুলিও সুপ্রিম কোর্টে ক্যাভিয়েট দাখিল করেছে, যাতে তাদের বক্তব্য না শুনে কোনো স্থগিতাদেশ দেওয়া না হয়।

 

আদালত আরও বলেছে, মুসলিম সম্প্রদায় চাইলে নতুন মসজিদ নির্মাণের জন্য অন্য কোনো জমি চেয়ে রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করতে পারবে এবং সরকারকে সেটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। এই মন্তব্য নিয়েও সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, অযোধ্যা মামলার পর ভোজশালা রায় ভারতের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করল। অনেকেই মনে করছেন, এই রায় ভবিষ্যতে কাশী বিশ্বনাথ-জ্ঞানভাপী ও মথুরার শাহী ঈদগাহসহ অন্যান্য বিতর্কিত ধর্মীয় স্থাপনার মামলাগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। একইসঙ্গে ভারতের Places of Worship Act 1991 নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ওই আইনে ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালের পর কোনো ধর্মীয় স্থাপনার চরিত্র পরিবর্তন না করার কথা বলা হলেও, সমালোচকদের মতে সাম্প্রতিক কয়েকটি মামলায় সেই আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

 

এদিকে জৈন সম্প্রদায়ের একটি অংশও দাবি করেছে, ভোজশালার সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এবং সেখানে জৈন ঐতিহ্যের নিদর্শন পাওয়া গেছে। যদিও মূল আইনি লড়াই ছিল হিন্দু ও মুসলিম পক্ষের মধ্যে।

 

রায়ের পর মধ্যপ্রদেশের ধার জেলায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসন আশঙ্কা করছে, বিষয়টি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কারণ হতে পারে। আদালত রাজ্য সরকারকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে লন্ডনের একটি জাদুঘরে সংরক্ষিত দেবী সরস্বতীর প্রাচীন মূর্তি ভোজশালায় ফিরিয়ে আনার বিষয়েও কেন্দ্রীয় সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে নয়; বরং ভারতের ইতিহাস, ধর্মীয় রাজনীতি, সংখ্যালঘু অধিকার এবং বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এখন সবার নজর ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দিকে, কারণ মুসলিম পক্ষ আপিল করলে বহুল আলোচিত এই মামলার পরবর্তী আইনি লড়াই সেখানেই নির্ধারিত হবে।


সম্পর্কিত নিউজ