{{ news.section.title }}
মমতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন কোন পথে?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী যখন শপথ নিচ্ছিলেন, ঠিক সেদিনই রাজ্যের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তার হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাসভবনে। দূরত্বে ব্রিগেড থেকে খুব বেশি নয়-বড়জোর দুই-তিন মাইল। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দূরত্ব যেন অনেক বড় হয়ে উঠেছিল।
সেদিন বিকেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বার্তা দিলেন, তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি সরাসরি দেশের বাম, অতিবাম ও জাতীয় শক্তিগুলোকে বিজেপির বিরুদ্ধে একসঙ্গে আসার আহ্বান জানান। এমনকি তিনি জানান, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শত্রুর শত্রুকেও বন্ধু ভাবতে তিনি প্রস্তুত।
আলোচনার দরজাও তিনি খোলা রাখেন। নিজের বাড়িতে কখন তাকে পাওয়া যাবে, সেটিও একই সঙ্গে জানিয়ে দেন। একসময় যাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনেছিলেন, এখন সেই বামপন্থি শক্তিকেই পাশে চাওয়ার এই আহ্বান রাজনৈতিকভাবে গভীর তাৎপর্য বহন করছে।
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসে, সেটি রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট তখন সমাজ, প্রশাসন, রাজনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের গভীরে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ফলে মাত্র এক দশকের কিছু বেশি বয়সী একটি দল এবং একক নেতৃত্বের ওপর দাঁড়িয়ে বামপন্থিদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া-অনেকের কাছেই একসময় প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছিল।
কিন্তু সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছিলেন মমতা। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করাই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। অথচ ১৫ বছর পর সেই মমতাকেই এখন লেফট ও আলট্রা লেফটদের সঙ্গে হাত মেলানোর কথা বলতে হচ্ছে। এই রাজনৈতিক অবস্থান যেন তার জীবনের এক পূর্ণ বৃত্ত সম্পন্ন হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
বামপন্থি দলগুলো অবশ্য তার আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু তৃণমূল নেত্রীর এই পদক্ষেপ স্পষ্ট করছে, নির্বাচনী বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলে তিনি আবারও নিজের রাজনৈতিক ঘর গোছানোর চেষ্টা শুরু করেছেন। প্রশ্ন হলো, এই পর্যায়ে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন?
কলকাতার যোগমায়া দেবী কলেজের ছাত্র রাজনীতি থেকে যার কংগ্রেসি রাজনীতিতে যাত্রা শুরু, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন পাঁচ দশকেরও বেশি দীর্ঘ। সংসদীয় রাজনীতিতে লোকসভা ও বিধানসভা মিলিয়ে তার উপস্থিতি ৪২ বছরেরও বেশি সময়ের। কিন্তু ৭১ বছর বয়সে বিজেপির নতুন দাপটের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কি তৃণমূলকে আবার সংগঠিত করতে পারবেন? নাকি তার নিজের হাতে গড়া দল ও রাজনৈতিক অধ্যায় এখন শেষের দিকে এগোচ্ছে-এই প্রশ্নই এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় হয়ে উঠেছে।
যাদবপুরের জয়ে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায়
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানের শুরু হয়েছিল কংগ্রেসের ভেতর থেকেই। ১৯৭৬ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মহিলা কংগ্রেসের (আই) সাধারণ সম্পাদক হন। পরে নিখিল ভারত যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
কলকাতার রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জির মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার লড়াকু মানসিকতা এবং অসাধারণ পরিশ্রম করার ক্ষমতা। তার রাজনৈতিক জীবনে বহুবার বিপর্যয় এসেছে। ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থায় পৌঁছেছিল। কিন্তু মমতা আবার দলকে সংগঠিত করেন এবং নতুনভাবে লড়াইয়ে ফেরেন।
প্রতীচী ট্রাস্টের সমন্বয়কারী সাবির আহমেদ মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনে অনেক ছোট-বড় ঘটনা তাকে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে আনে। তবে সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচন। সেবার কলকাতার যাদবপুর আসনে তিনি প্রবীণ সিপিআইএম নেতা সোমনাথ চ্যাটার্জিকে পরাজিত করেন।
সেটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক বড় চমক ছিল। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস দেশে বড় সহানুভূতি ভোট পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বামপন্থিদের শক্ত ঘাঁটি যাদবপুরে সোমনাথ চ্যাটার্জির মতো প্রতিষ্ঠিত নেতাকে একজন তরুণী ও অপেক্ষাকৃত অপরিচিত কংগ্রেস নেত্রীর কাছে হারতে হবে-এটা অনেকেই কল্পনা করেননি। সেই জয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তার উত্থান শুরু করে। দিল্লির রাজনীতিতেও তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নজরে আসেন।
তবে ১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসবিরোধী হাওয়ার মধ্যে মমতা আবার যাদবপুরেই পরাজিত হন। কিন্তু বেশি দিন তাকে রাজনীতির বাইরে থাকতে হয়নি। ১৯৯১ সালে কলকাতা দক্ষিণ আসন থেকে জিতে তিনি আবার লোকসভায় ফেরেন। এরপর আরও পাঁচবার লোকসভা সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
লোকসভা সদস্য থাকার সময় নানা ঘটনায় তার প্রতিবাদী ও লড়াকু চরিত্র সামনে আসে। নিজের দল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সিপিআইএমকে সহায়তার অভিযোগ তোলা, পেট্রোলিয়ামের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সংসদ ভবনে সরব হওয়া, এক সংসদ সদস্যের সঙ্গে হাতাহাতি, পশ্চিমবঙ্গের প্রতি বঞ্চনার অভিযোগে রেলমন্ত্রীর দিকে শাল ছুড়ে দেওয়া এবং এমপি পদ থেকে পদত্যাগের মতো ঘটনায় তিনি বারবার আলোচনায় আসেন।
১৯৯১ সালে পি ভি নরসিমা রাওয়ের সরকারে তিনি প্রথমবার কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হন। পরে ১৯৯৯ সালে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে তৃণমূল কংগ্রেস যোগ দিলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম থেকে ক্ষমতার দরজা
১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দলটি বামফ্রন্ট-শাসিত পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে ওঠে। ২০০৫ সালের পর থেকে বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পায়ন নীতির অংশ হিসেবে কৃষিজমি বরাদ্দকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অসন্তোষ তৈরি হয়। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলন তৃণমূল কংগ্রেসকে গ্রামীণ জনভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়।
নন্দীগ্রামে আন্দোলনরত মানুষের ওপর পুলিশের গুলিতে অন্তত ১৪ জন নিহত হওয়ার পর বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ আরও বাড়ে। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেত্রী থেকে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক মুখে পরিণত হন।
সাবির আহমেদের মতে, একসময় পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যে ধারণা ছিল, বামফ্রন্টকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব নয়। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সাহস মমতা দেখিয়েছিলেন। জমি অধিগ্রহণের প্রশ্নে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে সক্ষম হন। শিখা মুখার্জি মনে করেন, মমতার প্রাথমিক স্লোগান ছিল মূলত বামফ্রন্ট হটানো। কিন্তু নন্দীগ্রামের আন্দোলনের পর গ্রামীণ মানুষের মধ্যে তার রাজনৈতিক ভিত্তি দৃঢ় হয়। সেই ভিত্তিই পরে নির্বাচনী সাফল্যের পথ তৈরি করে।
২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের চেয়ে বেশি আসন পায় তৃণমূল কংগ্রেস। দুই বছর পর ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে তৃণমূল ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী। এরপর ২০১৬ ও ২০২১ সালের নির্বাচনেও তৃণমূল বড় ব্যবধানে জয়ী হয় এবং মমতা টানা ১৫ বছর রাজ্যের ক্ষমতায় থাকেন।
আন্দোলনের নেত্রী থেকে প্রশাসনের মুখ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনকে মোটামুটি দুই ভাগে দেখা যায়। ২০১১ সালের আগে তিনি ছিলেন মূলত আন্দোলনমুখী বিরোধী নেত্রী, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল বামফ্রন্টকে ক্ষমতা থেকে সরানো। আর ২০১১ সালের পর তিনি ছিলেন প্রশাসনের শীর্ষ পদে থাকা মুখ্যমন্ত্রী।
কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ১৫ বছরের শাসনামলের শেষ দিকে দুর্নীতির অভিযোগ তার দলকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাদামাটা জীবনযাপন, নীল-সাদা হাওয়াই চটি এবং ব্যক্তিগত সততার ভাবমূর্তি দীর্ঘদিন তার রাজনৈতিক পুঁজি ছিল। কিন্তু দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বাড়তে থাকায় সেই ভাবমূর্তিও চাপের মুখে পড়ে।
একাধিক নির্বাচনী সভায় মমতা নিজেই অভিমান প্রকাশ করে বলেন, ভুল করলে তাকে চড় মারা হোক, তিনি কিছু মনে করবেন না; প্রয়োজনে মানুষের বাড়িতে গিয়ে বাসনও মেজে দেবেন। কিন্তু তাকে যেন চোর বলা না হয়, মিথ্যা বদনাম দেওয়া না হয়।
তবে বিরোধীদের অভিযোগ শুধু দুর্নীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিজেপি ও সিপিআইএম প্রায় একই সুরে দাবি করেছে, রাজ্যে বড় শিল্প ও কর্মসংস্থান তৈরিতে মমতা সরকার ব্যর্থ। তাদের অভিযোগ, গত দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গে বড় বিনিয়োগ আসেনি। বিরোধীদের ভাষায়, মুখ্যমন্ত্রী বড় শিল্পের বদলে ধূপকাঠি বা তেলেভাজার মতো ক্ষুদ্র উদ্যোগ নিয়েই বেশি কথা বলেছেন।
প্রবীণ বাম নেতা শ্যামল চক্রবর্তী জীবদ্দশায় মন্তব্য করেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলে যতটা কার্যকর, প্রশাসক হিসেবে ততটা নন। তিনি সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত বাক্য ঘুরিয়ে বলেছিলেন-বন্যেরা বনে সুন্দর আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলে।
ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির সীমাবদ্ধতা
দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষের ধারণা ছিল, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও মমতা ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে। এই ধারণাই তাকে দীর্ঘ সময় রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে রেখেছিল। একসময় মমতার ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত কবি সুবোধ সরকার বলতেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সংযোগই তাকে আলাদা জনপ্রিয়তা দিয়েছে। তার মতে, দরিদ্র মানুষের উঠোনে বসে, তাদের ভাষায় কথা বলে, তাদের মতো করে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা মমতাকে মানুষের খুব কাছের করে তুলেছিল।
সুবোধ সরকারের ভাষায়, শহুরে দৃষ্টিতে মমতার এই আচরণ অনেকের কাছে অদ্ভুত মনে হতে পারে, অনেকে হাসাহাসিও করেছেন। কিন্তু তার মতে, সেটিই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সৌন্দর্য। তবে মমতাকে একমাত্রিক রাজনীতিক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। তার রাজনৈতিক চরিত্রে জনসংযোগ, প্রতিবাদ, আবেগ, কর্তৃত্ব, সংগঠন ও ব্যক্তিনির্ভর নেতৃত্ব-সবকিছু একসঙ্গে মিশে আছে।
কংগ্রেস নেতা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ওমপ্রকাশ মিশ্র একসময় মন্তব্য করেছিলেন, সংসদীয় রাজনীতির মর্যাদা রক্ষায় মমতা ব্যর্থ হয়েছেন। তার মতে, মমতা সব ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করতে চান। এমনকি তিনি বলেন, সব আসনে তিনিই প্রার্থী-অন্যরা যেন কেউ নন। মিশ্রের মতে, এতে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা দুর্বল হয়। যদিও কয়েক বছরের মধ্যেই ওমপ্রকাশ মিশ্র নিজে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আর তৃণমূল কংগ্রেসের সব দুর্বলতা ঢেকে জয় এনে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। দলের সাংগঠনিক সংকট, দুর্নীতির অভিযোগ, নেতৃত্বের ধরন এবং বিজেপির উত্থান-সব মিলিয়ে তৃণমূল বড় ধাক্কা খেয়েছে।
পরাজয়ের পর পুনরাগমনের প্রশ্ন
তৃণমূলঘেঁষা নাগরিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত প্রবীণ সাংবাদিক রন্তিদেব সেনগুপ্ত মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখনই অপ্রাসঙ্গিক বলে ধরে নেওয়া ভুল হবে। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, কেউ কেউ মমতাকে অপ্রাসঙ্গিক বলছেন এবং কেউ কেউ হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট থেকে দূরত্ব রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাদের মনে রাখা উচিত, মমতার সঙ্গে এখনো ৮০ জন বিধায়ক, লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে ৪২ জন এমপি এবং ৪১ শতাংশ ভোট রয়েছে।
রন্তিদেব আরও লেখেন, কাউকে রাতারাতি অপ্রাসঙ্গিক বলা উচিত নয়। প্রণব মুখার্জি ও অটলবিহারী বাজপেয়ীর রাজনৈতিক জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। রাজনীতি দীর্ঘ দৌড়; শুধু সংখ্যার বিচারে কাউকে অপ্রাসঙ্গিক বলে দেওয়া বোকামি। তবে পশ্চিমবঙ্গের অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হবে না। বরং তা অত্যন্ত কঠিন। তাদের মতে, তার পুনরুত্থান মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে।
প্রথমত, তিনি তৃণমূল কংগ্রেসকে কতটা অক্ষত রাখতে পারেন। বড় পরাজয়ের পর দল ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিজয়ী বিজেপি শিবিরে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের যোগদানের ঢল নামতে পারে বলেও অনেকে মনে করছেন। অতীতে বিরোধী দলের নেতা ভাঙিয়ে তৃণমূলে নেওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, এবার তার মূল্য তৃণমূলকেই দিতে হতে পারে-এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ কীভাবে সামলানো হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। মমতার ভাইপো এবং তৃণমূলের অঘোষিত উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত অভিষেকের দল পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ দীর্ঘদিন ধরেই আছে। করপোরেট ধাঁচে দল চালানো, পরামর্শদাতা সংস্থার ওপর নির্ভরতা, দুর্নীতি ও ঔদ্ধত্যের অভিযোগ-এসব নিয়ে তৃণমূলের ভেতরে ক্ষোভ বাড়ছে। নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর সেই ক্ষোভ আরও প্রকাশ্যে আসতে পারে। বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যবস্থা নিতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
তৃতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-মমতা আবার নিজের পুরনো বিরোধী নেত্রীর পরিচয়ে ফিরতে পারবেন কি না। সফল বিরোধী নেত্রী হিসেবে তার অতীত রেকর্ড অসাধারণ। কিন্তু নতুন বিজেপি সরকারের ভুলের জন্য অপেক্ষা করা, সেই ভুলকে জনআন্দোলনের ইস্যুতে পরিণত করা এবং রাজপথে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলা-এগুলোই এখন তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এখানেই বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার প্রশ্নও সামনে আসছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৭০ পেরিয়েছেন। একসময় যে পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রম, অনবরত সফর ও আন্দোলনের নেতৃত্ব তিনি দিতেন, এখন সেই একই গতি ধরে রাখা তার পক্ষে কতটা সম্ভব হবে-তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, মানুষ একবার কোনো দলকে ক্ষমতা থেকে সরালে সাধারণত তাদের দ্রুত আবার ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ দেয় না। বামফ্রন্টের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা দেখা গেছে। এখন প্রশ্ন-মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি সেই ইতিহাসের ব্যতিক্রম ঘটাতে পারবেন?
তৃণমূল নেত্রীর সামনে পথ কঠিন, কিন্তু একেবারে বন্ধ নয়। তার হাতে এখনো আছে বড় ভোটভিত্তি, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিধায়ক ও সংসদ সদস্য এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। তবে এই শক্তিগুলোকে সংগঠিত করে তিনি আবার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে দল ধরে রাখা, অভ্যন্তরীণ সংকট সামলানো এবং বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর জনআন্দোলন গড়ে তোলার সক্ষমতার ওপর।
সূত্র : বিবিসি বাংলা