{{ news.section.title }}
গভীর রাতে ছদ্মবেশে নারী পুলিশ কমিশনার, ৩ ঘণ্টায় ৪০ জনের কুপ্রস্তাব
ভারতের হায়দরাবাদে নারী নিরাপত্তার বাস্তব চিত্র জানতে গভীর রাতে ছদ্মবেশে রাস্তায় নেমে আলোচনায় এসেছেন মালকাজগিরির পুলিশ কমিশনার বি সুমতি। সাধারণ নারীর মতো পোশাক পরে কোনো পুলিশি প্রটোকল ছাড়াই তিনি একাকী বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। মাত্র তিন ঘণ্টার অভিযানে তার সামনে উঠে আসে উদ্বেগজনক চিত্র।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে ভোর সাড়ে ৩টা পর্যন্ত মালকাজগিরি থানা এলাকার কাছের একটি বাসস্ট্যান্ডে এই পর্যবেক্ষণমূলক অভিযান চালান সুমতি। তিনি সাধারণ নারীর ছদ্মবেশে সেখানে অবস্থান করেন, যাতে সাধারণ নারীরা রাতে রাস্তায় কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তা সরাসরি বোঝা যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই তিন ঘণ্টায় প্রায় ৪০ জন পুরুষ তার কাছে এগিয়ে আসে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্বাভাবিক আলাপের ভান করলেও পরে অশালীন আচরণ করে এবং কুপ্রস্তাব দেয়। কয়েকজনকে নেশাগ্রস্ত বলেও মনে হয়েছে। আবার তরুণ ও শিক্ষার্থীরাও ওই তালিকায় ছিল বলে জানানো হয়েছে।
ছদ্মবেশে থাকায় কেউ বুঝতে পারেননি যে তারা একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছেন। এ কারণেই রাতের শহরে একাকী নারীদের প্রতি অনেকের আচরণ কী রকম হয়, তা সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান পুলিশ কমিশনার। তার এই উদ্যোগ শুধু একটি অভিযান নয়, বরং নারী নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব দুর্বলতা বোঝার একটি মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ১ মে দায়িত্ব গ্রহণের পর মালকাজগিরির পুলিশ কমিশনার হিসেবে নারী নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন সুমতি। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি অভিযোগের কাগজ বা পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর না করে মাঠে নেমে বাস্তবতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তার মতে, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আগে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং সেসব এলাকায় টহল বাড়ানো জরুরি।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, অভিযানের পর উত্যক্তকারী বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে কমিশনার তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা না করে প্রথম পর্যায়ে সংশোধনের সুযোগ দিয়েছেন। অভিযুক্তদের থানায় ডেকে কাউন্সেলিং করা হয়েছে এবং জনসমক্ষে নারীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করার বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
সুমতি মনে করেন, অপরাধীদের শাস্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। শুধু পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। নারীদের একা দেখলেই বিরক্ত করা, অশালীন মন্তব্য করা বা কুপ্রস্তাব দেওয়া যে অপরাধমূলক আচরণ, সে বার্তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
এই অভিযানের পর মালকাজগিরির গুরুত্বপূর্ণ বাসস্ট্যান্ড, রাস্তা ও জনসমাগমস্থলে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সিসিটিভি ক্যামেরা বৃদ্ধি, রাতের টহল জোরদার এবং বিশেষ পুলিশি দল বা ‘শি টিম’-এর তৎপরতা বাড়ানো হবে। বিশেষ করে যেখানে রাতে নারী যাত্রী, কর্মজীবী নারী বা শিক্ষার্থীরা চলাচল করেন, সেসব জায়গাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
হায়দরাবাদের নারী আইপিএস সুমতির এমন ছদ্মবেশি অভিযান নতুন নয়। এর আগে কাজিপেট রেলওয়ে স্টেশনে ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্ট অব পুলিশ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিরাপত্তা পরিস্থিতি যাচাই করতে তিনি একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এবার মালকাজগিরির পুলিশ কমিশনার হিসেবে তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপই নারী নিরাপত্তা নিয়ে হওয়ায় স্থানীয় নারীদের মধ্যে বিষয়টি প্রশংসিত হয়েছে।
তবে এই ঘটনা নতুন করে বড় প্রশ্নও তুলেছে, রাতের শহরে একজন সাধারণ নারী কতটা নিরাপদ। একজন পুলিশ কমিশনার ছদ্মবেশে দাঁড়িয়ে মাত্র তিন ঘণ্টায় যদি ৪০ জনের অশালীন আচরণের মুখোমুখি হন, তাহলে প্রতিদিন কর্মস্থল, পড়াশোনা বা জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া সাধারণ নারীরা কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েন, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।