তামিলনাড়ু রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ, বিজয়ের বিপক্ষে জোটের আলোচনা

তামিলনাড়ু রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ, বিজয়ের বিপক্ষে জোটের আলোচনা
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ভারতের তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বুধবার গভীর রাতে এমন এক নাটকীয় মোড় দেখা গেছে, যা এক দিন আগেও প্রায় অকল্পনীয় ছিল। বিধানসভা নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় এখনও সরকার গঠন করতে পারেনি অভিনেতা ‘থালাপতি’ বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্রি কালাগাম (টিভিকে)।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে যখন বিজয় সম্ভাব্য মিত্র খুঁজতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী এআইএডিএমকের সঙ্গে নেপথ্যে যোগাযোগ শুরু করেছে এতদিনের ক্ষমতাসীন দল ডিএমকে। সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই দলের সম্ভাব্য সমঝোতা একেবারেই নজিরবিহীন। একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজয়ের দল প্রয়োজনীয় সংখ্যা জোগাড়ে ব্যর্থ হলে ডিএমকে ও এআইএডিএমকে একসঙ্গে আসতে পারে।

 

দুই দলের একাধিক সূত্রের দাবি, এআইএডিএমকেকে সরকার গঠনে সহায়তা করতে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে ডিএমকের ভেতরে। পাশাপাশি ছোট দলগুলোকেও সঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সূত্রগুলোর ভাষ্য, ‘এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে দলগুলোর ভেতরের বৈঠক ও নেতাদের যোগাযোগে পরিষ্কার, বিষয়টি আর শুধু গুঞ্জনের পর্যায়ে নেই।’ এআইএডিএমকের পক্ষ থেকেও আলোচনা হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়নি, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সমঝোতার কথা জানানো হয়নি। এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, কংগ্রেস-সমর্থিত বিজয়ের সরকার গঠন ঠেকাতে পুরোনো আঞ্চলিক শক্তিগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

 

এখন মূল প্রশ্ন হলো, তামিল রাজনীতির ইতিহাসে এমন অস্বাভাবিক সমীকরণে শেষ পর্যন্ত ডিএমকে সত্যিই রাজি হবে কি না। এবারের নির্বাচনে ডিএমকে পেয়েছে ৫৯টি এবং এআইএডিএমকে পেয়েছে ৪৭টি আসন। তবে এখানেও রয়েছে জটিলতা। দুই দলের আসন একত্র করলেও সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৬। অথচ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮ জন বিধায়কের সমর্থন। অর্থাৎ এই দুই দলের সম্ভাব্য জোটকেও ছোট দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে।

 

উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে তৎকালীন ডিএমকে প্রধান এম করুণানিধি দল থেকে বহিষ্কার করেন এম জি রামচন্দ্রনকে (এমজিআর)। পরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এআইএডিএমকে। সেই ঘটনার পর থেকেই তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে দুই দ্রাবিড় শক্তির দীর্ঘ সংঘাতের শুরু হয়। ডিএমকে নেতা এসএএস হাফিজুল্লাহর একটি সমাজমাধ্যম পোস্ট জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে। এক্স-এ তিনি লিখেছেন, ‘আপনারা খুব শিগগিরই এমন একটি খবর শুনবেন, যা তামিলনাড়ু ও গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক হবে।’

 

সরকার গঠনের দাবি তুললেও সংখ্যার অঙ্কে আটকে বিজয়

এর আগে মঙ্গলবার (৬ মে) সকালেই রাজনীতিতে নতুন মোড় আসে। সরকার গঠনের দাবি জানাতে তামিলনাড়ুর গভর্নর রাজেন্দ্র আর্লেকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিজয়। তবে তিনি ১১২ জন বিধায়কের সমর্থনপত্র জমা দেওয়ায় রাজ্যপাল তাকে ১১৮ জনের সমর্থন নিশ্চিত করে আবার দেখা করতে বলেন। ৫ আসন পাওয়া কংগ্রেস বিজয়কে সমর্থনের আশ্বাস দিলেও তা নাকি এখন পর্যন্ত মৌখিক পর্যায়েই রয়েছে। প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড়ের জন্য সময়ও চেয়েছেন বিজয়।

 

২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই ১০৮টি আসন জিতে বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে টিভিকে। কিন্তু সরকার গঠনের জন্য এখনও তাদের প্রয়োজন আরও ১০টি আসন। সম্ভাব্য শরিকরাও এখনও স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘কিংমেকার’ হিসেবে উঠে আসতে পারে ভিসিকে (ভিদুথালাই চিরুথাইগাল কাটচি)। তবে বৃহস্পতিবার নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করে দলটি নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা থেকে আপাতত বিরত রয়েছে।

 

বুধবার রাত পর্যন্ত টিভিকে নেতৃত্বের ধারণা ছিল, প্রথমে বিজয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন, পরে বিধানসভায় আস্থা ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের সুযোগ পাবেন। কিন্তু গভর্নরের কঠোর অবস্থানের কারণে সেই পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সেই সুযোগেই সক্রিয় হয়ে ওঠে পুরোনো দ্রাবিড় শক্তি ডিএমকে ও এআইএডিএমকে। সূত্রের দাবি, প্রথমে এআইএডিএমকের তরফ থেকেই যোগাযোগ করা হয় এবং ডিএমকে তা সরাসরি নাকচ করেনি।

 

অন্যদিকে বাম দল সিপিএম ও সিপিআই এখনও বিজয়কে সমর্থনের ঘোষণা দেয়নি। তারা আগামী ৮ মে পর্যন্ত নিজেদের সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছে। এই দুই দল এবং ভিসিকে-সবাই ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ। সূত্রের মতে, তারা অবস্থান বদলাবে না বলে ডিএমকে নেতৃত্ব আত্মবিশ্বাসী।

 

আরো পড়ুন : বিজয়ের জয়ের পেছনে যে ‘গোপন শক্তি’ ছিল, জানলে অবাক হবেন!

 

এরই মধ্যে টিভিকের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ (আইইউএমএল) ও বামপন্থি দলগুলো। ফলে বিজয়ের সরকার গঠনের সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তার ওপর ডিএমকে ও এআইএডিএমকের গোপন আলোচনা প্রকাশ্যে আসায় ছোট দলগুলো আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

 

‘যদি বিজয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে না পারেন’

এই রাজনৈতিক টানাপড়েনের কেন্দ্রে রয়েছে কংগ্রেসের অবস্থান। টিভিকেকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের স্থানীয় নির্বাচন, রাজ্যসভা ও লোকসভা নির্বাচনেও একসঙ্গে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে দলটি। শুরুতে মনে করা হয়েছিল, কংগ্রেসের সমর্থন বিজয়ের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথ সহজ করবে। কিন্তু পরে দেখা যায়, এই অবস্থানের ফলে সম্ভাব্য অন্যান্য মিত্রদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন তিনি।

 

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে এনডিএ জোটের একাধিক শরিক দলের সূত্র জানিয়েছে, কংগ্রেস-টিভিকের সমঝোতা পুরো রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে। এনডিএ শিবিরের দুই নেতার দাবি, কংগ্রেস-সমর্থিত টিভিকে যাতে সরকার গঠন করতে না পারে, সে বিষয়ে শরিক দলগুলোকে আগেই বার্তা দেওয়া হয়েছে ‘দিল্লি’ থেকে। অন্যদিকে কংগ্রেসের আচরণে ক্ষুব্ধ ডিএমকে নেতৃত্বও। দলের এক প্রবীণ নেতার ভাষ্য, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনকে ফোনে রাহুল গান্ধী বলেছিলেন, ‘আমি আপনার সঙ্গেই আছি।’ কিন্তু তার পরদিনই কংগ্রেস টিভিকেকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানায়।

 

চেন্নাইয়ের রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে একটি প্রশ্ন-‘যদি বিজয় ব্যর্থ হন?’ বুধবার রাতের নতুন রাজনৈতিক তৎপরতার পেছনেও মূলত এই সম্ভাবনাই কাজ করছে। এদিকে এআইএডিএমকে সূত্র জানিয়েছে, দলের প্রায় ৫০ জন বিধায়ককে অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও কৌশল নির্ধারণের জন্য পুদুচেরির একটি রিসর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

 

রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন, বিজয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ব্যর্থ হলে এআইএডিএমকে সরকার গঠনের দাবি তুলতে পারে। তখন বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে ডিএমকে। পাশাপাশি ছোট দলগুলোকেও ওই সমীকরণে যুক্ত করা হতে পারে। সম্ভাব্য এই জোটে এনডিএ শরিক পিএমকে ও এএমএমকের পাশাপাশি সিপিএম (২), সিপিআই (২), ভিসিকে, ডিএমডিকে (১) ও আইইউএমএলের (২) মতো দলও থাকতে পারে।

 

তবে দুই দ্রাবিড় শিবিরের একাংশ প্রকাশ্যে বলছে, তারা জনরায় বা বিজয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে না। তাদের দাবি, তারা শুধু সাংবিধানিক নিয়ম মেনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দেখতে চায়। সূত্রগুলোর বক্তব্য, ‘বিজয় সফল হলে তিনিই সরকার চালাবেন। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হলে সাংবিধানিকভাবেই অন্য বিকল্প সামনে আসবে।’


সম্পর্কিত নিউজ