{{ news.section.title }}
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন, বন্ধ হচ্ছে ৫ আর্থিক প্রতিষ্ঠান
দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংকটের মধ্যে এবার বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উচ্চ খেলাপি ঋণ, আর্থিক অনিয়ম এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ।
আগামী জুলাই মাস থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন বা কার্যক্রম বন্ধের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়নের তালিকায় রয়েছে সেগুলো হলো- এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ঋণের অর্থ আদায় না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতেও তারা ব্যর্থ হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন ব্যাংক রেজুলেশন আইনের আওতায় এসব প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। আইন অনুযায়ী আর্থিকভাবে দুর্বল বা অকার্যকর প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন, একীভূত কিংবা বন্ধ করার বিধান রয়েছে।
অবসায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন পরিচালককে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। তার সঙ্গে আরও দুজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও দায় যাচাই-বাছাই করে পাওনাদারদের অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যক্তিগত আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। এ অর্থের জন্য আগামী জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক আশ্বাস পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই নিশ্চয়তার পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবসায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে দুর্বল এনবিএফআইগুলোর কারণে পুরো আর্থিক খাতে যে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়েছে, সেটিও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর আগে গত বছরের মে মাসে উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০টি এনবিএফআইকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তাদের জিজ্ঞাসা করা হয় কেন এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়ন করা হবে না।
পরে নয়টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশ কয়েকটির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। তখন বন্ধ বা অবসায়নের জন্য বিবেচনায় আনা হয়- ফাস্ট ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্সসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে।
তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তালিকা পুনর্বিবেচনা করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া হয়। তখন জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও বিআইএফসিকে অবসায়নের তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সর্বশেষ প্রিমিয়ার লিজিংকেও তালিকা থেকে বাদ দেওয়ায় বর্তমানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্তভাবে অবসায়নের পথে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্স-এর খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ফারইস্ট ফাইন্যান্স-এর খেলাপি ঋণ ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্স-এর ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, পিপলস লিজিং-এর প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং-এর ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত বছরগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দেশের এনবিএফআই খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা পিকে হালদার-এর নাম বারবার উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) থেকে অন্তত সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত পুনর্গঠন বা বন্ধ করা না গেলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপকে আর্থিক খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।