যেভাবে কার্যকর হতে পারে নতুন পে-স্কেল

যেভাবে কার্যকর হতে পারে নতুন পে-স্কেল
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে আবারও জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগামী জুনে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হতে যাওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটেই নতুন পে-স্কেল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসতে পারে। তবে একযোগে পুরো সুবিধা কার্যকর না করে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার।

জানা গেছে, আগামী ৭ জুন বিকেল ৩টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশন শুরু হবে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ইতোমধ্যে এ অধিবেশন আহ্বান করেছেন। ওই অধিবেশনেই অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন। বাজেট বক্তব্যের সময় নতুন পে-স্কেলের রূপরেখা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

 

ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একবারে পুরো বেতন কাঠামো কার্যকর করলে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। এজন্য নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল নেওয়া হচ্ছে।

 

প্রাথমিকভাবে আগামী বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বরাদ্দ নিয়ে কাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে মূল বেতন আংশিক বাড়ানো হতে পারে। এরপর পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য ভাতা। সরকারের লক্ষ্য ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ সুবিধা কার্যকর করা।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে-কমিশনের আওতায় প্রায় ১৪ লাখ কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী আর্থিক সুবিধার আওতায় আসবেন। ফলে এটি দেশের অন্যতম বড় প্রশাসনিক আর্থিক সংস্কার হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

 

কেন জরুরি হয়ে উঠেছে নতুন পে-স্কেল

২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণার পর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেছে। এ সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

সরকারি চাকরিজীবীদের সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীরা বর্তমানে বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছেন। তাদের দাবি, দ্রুত জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এর চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করতে হবে।অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং বাজারে অর্থপ্রবাহও বৃদ্ধি পাবে। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

 

স্বাধীনতার পর নবম পে-স্কেলের পথে বাংলাদেশ

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে দেশে প্রথম জাতীয় বেতন স্কেল চালু হয়। এরপর ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট আটবার নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পরপর নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও করোনা মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, রাজস্ব চাপ এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নবম পে-স্কেলের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন পিছিয়ে যায়।

 

বর্তমানে নতুন প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা চলছে। এ লক্ষ্যে গঠিত ১০ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি বিভিন্ন সুপারিশ যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত মতামত প্রস্তুতের কাজ করছে।

 

সম্ভাব্য বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনা

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনায় থাকা প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, প্রথম গ্রেডের বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। দ্বিতীয় গ্রেডে সম্ভাব্য বেতন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। তৃতীয় গ্রেডে ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা এবং চতুর্থ গ্রেডে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেতন নির্ধারণের আলোচনা চলছে।

 

এছাড়া পঞ্চম থেকে নবম গ্রেড পর্যন্তও উল্লেখযোগ্য হারে বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। দশম গ্রেডে সম্ভাব্য বেতন ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা এবং একাদশ গ্রেডে ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের আলোচনা রয়েছে। নিচের গ্রেডগুলোর ক্ষেত্রেও বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

 

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এগুলো এখনো প্রস্তাবিত মাত্র। সরকারিভাবে গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরই নবম জাতীয় পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো জানা যাবে।


সম্পর্কিত নিউজ