নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে যা জানা গেল

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে যা জানা গেল
ছবির ক্যাপশান, জাগরণ ছবি

সরকারি চাকরিজীবীদের বহুদিনের প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটেই নতুন পে স্কেলের প্রাথমিক রূপরেখা ঘোষণা করা হতে পারে। যদিও দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় পূর্ণাঙ্গ সুবিধা বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে করা হবে এবং পুরো কাঠামো কার্যকর হতে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হচ্ছে।

২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পর দীর্ঘ এক দশক কেটে গেছে। এ সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বাড়িভাড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

 

ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একবারে বড় অঙ্কের আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হতে পারে। তাই নতুন পে স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

 

প্রাথমিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখার চিন্তা চলছে। প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধি করা হতে পারে। পরবর্তীতে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য ভাতা পর্যায়ক্রমে সমন্বয় করে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সুবিধা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় প্রায় ১৪ লাখ নিয়মিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি উপকৃত হবেন। ফলে এটি দেশের অন্যতম বড় আর্থিক সংস্কার হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

 

কেন জরুরি হয়ে উঠেছে নতুন পে স্কেল

সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলোর দাবি, গত কয়েক বছরে মুদ্রাস্ফীতি অনেক বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান বেতন কাঠামো দিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। বাজারে চাল, ডাল, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। অনেক কর্মচারী বিশেষ করে ১৩ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মীরা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

 

বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির নেতারা বলছেন, নতুন স্কেল বাস্তবায়নের আগে ‘জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫’-এর চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা প্রয়োজন। তাদের মতে, শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়; বাস্তব বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাতা কাঠামোও পুনর্নির্ধারণ করা জরুরি।

 

সম্ভাব্য নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনা

ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে স্কেলের সম্ভাব্য গ্রেডভিত্তিক তালিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও সরকারিভাবে এখনো কোনো চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ হয়নি, তবুও প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী প্রথম গ্রেডের বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতনেও বড় ধরনের সমন্বয়ের প্রস্তাব এসেছে।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়িত হলে একদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে বাজারে অর্থের প্রবাহও বৃদ্ধি পাবে। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলেও তারা সতর্ক করছেন।

 

সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, রিজার্ভ পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন সরকারের জন্য বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে আইএমএফের ঋণ শর্ত, ভর্তুকি ব্যয় এবং বাজেট ঘাটতির বিষয়গুলো সরকারকে সতর্কভাবে বিবেচনা করতে হবে। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারি প্রশাসনে কর্মোদ্যম বাড়বে এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 

বাজেটেই মিলতে পারে বড় ইঙ্গিত

আগামী জাতীয় বাজেট ঘিরে সরকারি চাকরিজীবীদের আগ্রহ এখন তুঙ্গে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, আসন্ন বাজেট বক্তৃতায় নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসতে পারে। যদিও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের সময়সূচি ও চূড়ান্ত গ্রেড কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবুও সরকারের সক্রিয় প্রস্তুতি সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

 

২০২৬ সালের প্রস্তাবিত নবম জাতীয় বেতন স্কেল

নিচে গ্রেডভিত্তিক সম্ভাব্য বেতন কাঠামোর একটি প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হলো। তবে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর এতে পরিবর্তন আসতে পারে।

 

গ্রেডপ্রস্তাবিত বেতন স্কেল
০১১,৬০,০০০ টাকা (নির্ধারিত)
০২১,৩২,০০০ – ১,৫৩,০০০ টাকা
০৩১,১৩,০০০ – ১,৪৮,৮০০ টাকা
০৪১,০০,০০০ – ১,৪২,৪০০ টাকা
০৫৮৬,০০০ – ১,৩৯,৭০০ টাকা
০৬৭১,০০০ – ১,৩৪,০০০ টাকা
০৭৫৮,০০০ – ১,২৬,৮০০ টাকা
০৮৪৭,২০০ – ১,১৩,৭০০ টাকা
০৯৪৫,১০০ – ১,০৮,৮০০ টাকা
১০৩২,০০০ – ৭৭,৩০০ টাকা
১১২৫,০০০ – ৬০,৫০০ টাকা
১২২৪,৩০০ – ৫৮,৭০০ টাকা
১৩২৪,০০০ – ৫৮,০০০ টাকা
১৪২৩,৫০০ – ৫৬,৮০০ টাকা
১৫২২,৮০০ – ৫৫,২০০ টাকা
১৬২১,৯০০ – ৫২,৯০০ টাকা
১৭২১,৪০০ – ৫১,৯০০ টাকা
১৮২১,০০০ – ৫০,৯০০ টাকা
১৯২০,৫০০ – ৪৯,৬০০ টাকা
২০২০,০০০ – ৪৮,৪০০ টাকা

সম্পর্কিত নিউজ