{{ news.section.title }}
যে কারণে বাংলাদেশকে ৩৫ কোটি ডলার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত সরবরাহ ঝুঁকি এবং এলএনজির মূল্যবৃদ্ধির চাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ৩৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক।
সোমবার (১৮ মে) প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, এই অর্থায়ন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, এলএনজি আমদানি আরও পরিকল্পিত করা এবং বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। অর্থায়নটি ১৫ মে অনুমোদিত হয় বলে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো বিশ্বব্যাংকের বিজ্ঞপ্তির বরাতে জানিয়েছে।
এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে ‘এনার্জি সেক্টর সিকিউরিটি এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট’–এর অতিরিক্ত অর্থায়ন হিসেবে। মূল প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ১৮ জুন বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন করে। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে। মূল প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে সাশ্রয়ী অর্থায়নে প্রবেশাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহ নিরাপত্তা জোরদার করা এবং দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির জন্য অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মাধ্যমে পেট্রোবাংলার জন্য পেমেন্ট সিকিউরিটি ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা তৈরি করা হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করা যায়। এর ফলে ব্যয়বহুল স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং গ্যাস সরবরাহ তুলনামূলকভাবে পূর্বানুমানযোগ্য হবে। বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, আইডিএ গ্যারান্টির মাধ্যমে সাত বছরে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেসরকারি মূলধন mobilize করার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারের বড় চাপের মুখে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে এলএনজির দাম বেড়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেজমে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এই সহায়তা অর্থনীতি ও জনগণকে বাইরের ধাক্কা থেকে সুরক্ষা দিতে ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন ও সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় কয়েক বছর ধরে এলএনজি আমদানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে তা সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ, শিল্পের জ্বালানি ব্যয়, সরকারি ভর্তুকি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি করে।
নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে এলএনজি আমদানিতে ব্যাংক গ্যারান্টি, স্বল্পমেয়াদি ক্রেডিট লাইন এবং পেমেন্ট নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। এতে সরবরাহকারীদের কাছে পেট্রোবাংলার ঋণযোগ্যতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি বাস্তবায়ন সহজ হবে। বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প নথিতে বলা হয়েছে, পেট্রোবাংলার সময়মতো পেমেন্ট করার সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি ক্রয়ের জন্য বাণিজ্যিক অর্থায়ন নিশ্চিত করাই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অর্থায়ন তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশকে কিছুটা স্বস্তি দেবে। কারণ স্পট মার্কেটে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হলে সরকারের ব্যয় বেড়ে যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ অনিশ্চিত হয় এবং শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে আমদানি করা গেলে বাজারের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু এলএনজি আমদানির অর্থায়ন দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি, গ্যাস ব্যবহারে অপচয় কমানো এবং শিল্পে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন জরুরি। বিশ্বব্যাংকের মূল প্রকল্প ঘোষণাতেও গ্যাস সরবরাহ নিরাপত্তা ও বায়ুদূষণ কমানোর মতো বৃহত্তর উন্নয়ন অগ্রাধিকারকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এর আগে মার্চে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ জ্বালানি ও এলএনজি সংকট সামাল দিতে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি নতুন অর্থায়নের দিকে তাকিয়ে আছে। ওই প্রতিবেদনে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জ্বালানি আমদানির অর্থপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে দেওয়া যাবে না এবং সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্য করার চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের নতুন ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি আমদানি ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি এলএনজি সরবরাহ স্থিতিশীল করা, বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা, শিল্প খাত সচল রাখা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার ধাক্কা কিছুটা সামাল দিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানিনির্ভরতা কমানো, দেশীয় সম্পদের উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।