বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা প্রত্যাশিত অগ্রগতি না পাওয়ায় নতুন করে অস্থির হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক পণ্যবাজার। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে। আর তেলের দাম বাড়ার ফলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে-এমন শঙ্কায় আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

সোমবার (১১ মে) বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা ৭ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৬৫৭ দশমিক ৮৯ ডলারে নেমে আসে। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার প্রায় ১২২ টাকা ধরে) যার মূল্য প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ টাকা। একই সময়ে জুন ডেলিভারির জন্য মার্কিন গোল্ড ফিউচারসের দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৬৬৫ দশমিক ৭০ ডলারে দাঁড়ায়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ লাখ ৬৯ হাজার ২১৭ টাকার সমান।

 

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের দেওয়া পাল্টা শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলে প্রায় ১০ সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই ভেঙে পড়ে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইতোমধ্যে ইরান, লেবানন ও উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে, যেখানে এখনও শত শত জাহাজ চলাচল সংকটের মুখে রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ঝুঁকির অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে সামান্য উত্তেজনাও বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছে।

 

সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলারের ওপরে অবস্থান করে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৬৮৮ টাকার সমান। অন্যদিকে মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও ৯৫ ডলারের বেশি উঠে যায়, যার মূল্য বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১১ হাজার ৫৯০ টাকা।

 

বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, “বিনিয়োগকারীরা এখন বুঝতে পারছেন, খুব দ্রুত কোনো শান্তি চুক্তি হচ্ছে না। একই সঙ্গে তেলের বাজার আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, যা স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি করছে।”

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণভাবে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি ভিন্ন চিত্র তৈরি হয়েছে। কারণ তেলের দাম বাড়লে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে বাধ্য হতে পারে। আর উচ্চ সুদের হার সাধারণত স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদের জন্য নেতিবাচক।

 

মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সাম্প্রতিক অর্ধবার্ষিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সংঘাত ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, যদি তেলের দাম আরও বাড়তে থাকে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির নতুন ঢেউ তৈরি হতে পারে।

 

এদিকে বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসও তাদের সুদের হার কমানোর পূর্বাভাস পিছিয়ে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আগে তারা ধারণা করেছিল মার্কিন ফেড চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বরেই সুদের হার কমাতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা এখন মনে করছে, ফেড হয়তো ২০২৬ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৭ সালের মার্চের আগে সুদের হার কমাবে না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করা হয়েছে।

 

বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এখন যুক্তরাষ্ট্রের এপ্রিল মাসের ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) প্রতিবেদনের দিকে। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত হতে যাওয়া এই তথ্য থেকে বোঝা যাবে মূল্যস্ফীতি কতটা বাড়ছে এবং ফেড ভবিষ্যতে কী ধরনের মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে পারে।

 

চীনের বাজার থেকেও স্বর্ণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে। চায়না গোল্ড অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির স্বর্ণ উৎপাদন কমেছে। নিরাপত্তা পরিদর্শনের কারণে কয়েকটি বড় গলন কারখানায় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণ উৎপাদক ও ভোক্তা দেশ হওয়ায় এর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়ছে।

 

অন্যদিকে শুধু স্বর্ণ নয়, অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট রুপার দাম শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৮০ দশমিক ১৩ ডলারে নেমেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার ৭৭৬ টাকা। প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ২ হাজার ২৯ দশমিক ৯৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যার মূল্য বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬৫৪ টাকা। আর প্যালাডিয়ামের দাম শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৪৮১ দশমিক ৯ ডলারে নেমেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ৭৯২ টাকার সমান।

 

বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তেল ও স্বর্ণ-দুই বাজারেই বড় ধরনের অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে। তাদের মতে, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ ডলারের মধ্যেই ওঠানামা করতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ