প্রথম ধাপের পে স্কেলে কারা পাচ্ছেন সুবিধা? জেনে নিন

প্রথম ধাপের পে স্কেলে কারা পাচ্ছেন সুবিধা? জেনে নিন
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় বেতন কমিশন–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান রয়েছে-এমন সরকারি চাকরিজীবী পরিবারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর সঙ্গে বড় অঙ্কের আর্থিক সংশ্লেষ থাকায় শুরুতেই সবার জন্য পূর্ণাঙ্গ সুবিধা কার্যকর করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আগের মতো ২০টি গ্রেড বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ রয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত রাখা হয়েছে ১:৮, যা বর্তমান ১:৯ দশমিক ৪ অনুপাতের তুলনায় কম। এর মাধ্যমে নিম্ন ও উচ্চ গ্রেডের বেতন বৈষম্য কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

 

সূত্র মতে, নতুন বাজেটে বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এই অর্থ দিয়ে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর মূল বেতনের একটি অংশ প্রথম ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে প্রথম কিস্তির বড় অংশ ব্যয় হতে পারে। মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, নিত্যপণ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ওপর আর্থিক চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে-এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই প্রথম ধাপের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হচ্ছে।

 

কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন পুরোপুরি করতে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর পেছনে সরকারের ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। ফলে নতুন পে স্কেল একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

নতুন বেতন কাঠামোর আলোচনায় সবচেয়ে মানবিক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে পেনশনভোগীদের সুবিধা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবকে। বর্তমানে যারা মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের পেনশন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। অর্থ বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে এই ক্ষুদ্র পেনশনভোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশনপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম, অর্থাৎ প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত রাখার প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। এতে সীমিত বরাদ্দের মধ্যে তুলনামূলক কম আয়ের পেনশনভোগীদের বেশি সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

 

পেনশনভোগীদের চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রেও নতুন কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ৭৫ বছর বা তার বেশি বয়সী পেনশনভোগীদের মাসিক চিকিৎসা ভাতা ১০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতার প্রস্তাব রয়েছে। বয়সভেদে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় এই প্রস্তাবকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

প্রস্তাবিত কাঠামোতে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের টিফিন ভাতা বিদ্যমান ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের দৈনন্দিন ব্যয় বিবেচনায় এই পরিবর্তনটি প্রথম ধাপেই কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে সূত্রের দাবি। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের বৈশাখী ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার বিষয়টিও অগ্রাধিকার আলোচনায় রয়েছে। কমিশনের সুপারিশে স্বাস্থ্যবিমা, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার এবং সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠনের মতো বিষয়ও এসেছে।

 

সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে সরকারি কর্মচারীদের কোনো প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতার প্রস্তাব করেছে কমিশন। অর্থ বিভাগ এই প্রস্তাবকে মানবিক বিবেচনায় ইতিবাচকভাবে দেখছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রস্তাবটি প্রথম ধাপে কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবী পরিবারের একটি বিশেষ অংশ সরাসরি উপকৃত হবে।

 

কেবল নিম্নস্তরের কর্মচারী নয়, সরকারি চাকরিতে মেধাবীদের ধরে রাখা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যেও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে উচ্চপদের বড় অঙ্কের সুবিধাগুলো পরবর্তী দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হতে পারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব ও সিনিয়র সচিবদের জন্য ২০ ধাপের বাইরে আলাদা ধাপ নির্ধারণের প্রস্তাবও আলোচনায় আছে, যা চূড়ান্ত হলে পরে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি হতে পারে।

 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব আহরণ, বাজেট ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দেওয়া। বেতন বাড়লে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা একদিকে জীবনযাত্রায় স্বস্তি দিতে পারে; অন্যদিকে বাজারে চাহিদা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। এ কারণে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নকে তুলনামূলক নিরাপদ পথ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হকও ধাপে বাস্তবায়নকে বাজারে আকস্মিক চাপ কমানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন।

 

এর আগে ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হয়নি। এই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয়, নিত্যপণ্যের দাম, চিকিৎসা ব্যয়, বাড়িভাড়া ও পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন পে স্কেলের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই জোরালো ছিল।


সম্পর্কিত নিউজ