{{ news.section.title }}
বৃষ্টি হলেও মিলছে না স্বস্তি, ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা বেড়েছে
ঢাকার বায়ুমানের অস্থিরতা যেন এখন নতুন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি হলেও রাজধানীর বাতাসে স্থায়ী উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। সোমবারের বিভিন্ন সময়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঢাকার বায়ুর মান একেক সময়ে একেক মাত্রায় ওঠানামা করলেও সামগ্রিক চিত্রটি উদ্বেগজনকই রয়ে গেছে।
সকালে স্থানীয় কিছু প্রতিবেদনে ঢাকার অবস্থান বিশ্বে সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় উপরের দিকেই ছিল, আর দুপুরের পর আইকিউএয়ারের লাইভ ডেটাতেও ঢাকার বিভিন্ন মনিটরিং পয়েন্টে ‘unhealthy for sensitive groups’ থেকে ‘moderate’-এই দুইয়ের মধ্যে ওঠানামা করতে দেখা গেছে।
আইকিউএয়ারের ঢাকাভিত্তিক লাইভ ডেটা অনুযায়ী, ৪ মে দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে ঢাকায় ১৮টি স্টেশন থেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছিল। একই সময়ে আজিমপুরের AQI ছিল ১২২, পল্টানে ১০০, গাজীপুরে ৯০, আর ঢাকার একটি সামগ্রিক শহর রিডিং ৬৬–৯৫ এর মধ্যে ঘুরছিল। অর্থাৎ বৃষ্টির প্রভাব কিছু জায়গায় সাময়িক স্বস্তি দিলেও পুরো মহানগরে দূষণ একসঙ্গে কমেনি। এই ওঠানামাই দেখাচ্ছে যে শুধু এক-দুই দিনের বৃষ্টি ঢাকার দীর্ঘমেয়াদি দূষণ সমস্যার সমাধান নয়।
আজকের অবস্থান কেন গুরুত্বপূর্ণ
AQI বা Air Quality Index-এর হিসেবে ১০১ থেকে ১৫০-এর মধ্যে থাকা মানকে ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ ধরা হয়। এই স্তরে শিশু, বয়স্ক, হাঁপানি বা শ্বাসতন্ত্রের রোগী, হৃদরোগী এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের জন্য বাইরের বাতাস ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। আইকিউএয়ারের শহরভিত্তিক লাইভ তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় আজ PM2.5-এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নিরাপদ সীমার বহু গুণ বেশি ছিল। দুপুরের এক পর্যায়ে PM2.5 ঘনত্ব ৩২.৭ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার দেখানো হয়, যা WHO-এর বার্ষিক ৫ মাইক্রোগ্রাম নির্দেশিকার প্রায় ৬.৫ গুণ।
ঢাকার বাতাস কেন এত দ্রুত খারাপ হয়ে পড়ে, তার উত্তরও কিছুটা পরিষ্কার। বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, রাজধানীর দূষণের বড় উৎস হচ্ছে সূক্ষ্ম বস্তুকণা PM2.5 ও PM10, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, শিল্পকারখানার নির্গমন, ইটভাটা এবং শুষ্ক মৌসুমে জমে থাকা দূষিত কণা। বাংলাদেশে AQI হিসাব করা হয় মূলত পাঁচটি প্রধান দূষক-PM10, PM2.5, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড এবং ওজোনের ভিত্তিতে।
এপ্রিলজুড়ে ঢাকার বায়ুমান কেমন ছিল
এপ্রিলের চিত্রও কিন্তু খুব স্বস্তিদায়ক ছিল না। যদিও মাসের শেষ দিকে কয়েক দফা বৃষ্টির পর ২৯ এপ্রিল সকালে ঢাকার AQI নেমে ৬১-এ এসেছিল এবং সেদিন শহরটি দূষিত শহরের তালিকায় ৩৮তম অবস্থানে ছিল, তবু সেটি ছিল সাময়িক উন্নতি। ওই দিন বাতাসকে ‘moderate’ বলা হলেও প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়, ঢাকার বায়ুমান সাধারণত শীত ও শুষ্ক মৌসুমে বেশি খারাপ হয় এবং বর্ষার দিকে গেলে কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। অর্থাৎ এপ্রিলের শেষের স্বস্তি ছিল পুরো মাসের প্রবণতার ব্যতিক্রম, স্থায়ী পরিবর্তন নয়।
আবার ৩ মে-র চিত্রে দেখা যায়, ঢাকার AQI ছিল ১৩৭ এবং শহরটি বিশ্বে চতুর্থ দূষিত শহর হিসেবে উঠে আসে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ঢাকা ‘moderate’ অবস্থা থেকে আবার ‘unhealthy for sensitive groups’ শ্রেণিতে ফিরে যায়। এই দ্রুত ওঠানামা প্রমাণ করছে, আবহাওয়ার ক্ষণিক পরিবর্তন ঢাকার বাতাসকে অল্প সময়ের জন্য ভালো করলেও মূল দূষণ উৎসগুলো সক্রিয় থাকলে পরিস্থিতি আবার দ্রুত খারাপ হয়ে পড়ে।
শুধু আজ নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট
ঢাকার বায়ুদূষণ সমস্যাকে আলাদা করে এক দিনের ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আইকিউএয়ারের ২০২৫ সালের বিশ্ব বায়ুমান প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক দূষিত দেশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের গড় PM2.5 মাত্রা ছিল ৬৬.১ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার, যা WHO নির্দেশিকার প্রায় ১৩.২ গুণ। একই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী ঢাকার গড় PM2.5 ছিল ৭৮ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার, যা রাজধানী শহরটির দীর্ঘমেয়াদি বায়ু সংকটকে আরও স্পষ্ট করে।
আইকিউএয়ারের বিভিন্ন বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ঢাকার বায়ুদূষণ শীতকালে সাধারণত বেশি খারাপ হয়, কারণ তখন বৃষ্টিপাত কম থাকে, বাতাসের গতি কমে, আর সূক্ষ্ম কণা বাতাসে বেশি সময় আটকে থাকে। মার্চ ও ফেব্রুয়ারিতে একাধিক দিনে ঢাকার AQI ২০০-এর ওপরে গিয়েছিল, এমনকি কিছু সময় ৩০০-এর কাছাকাছিও পৌঁছায়। এর অর্থ হলো, এপ্রিলের কিছু মাঝারি দিনের পরও মূল সমস্যা কোথাও যায়নি।
বৃষ্টি কেন স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না
বৃষ্টি সাধারণত বাতাসে ভাসমান কিছু কণা ধুয়ে নামাতে সাহায্য করে, তাই বৃষ্টির পরে AQI কিছুটা কমে যেতে দেখা যায়। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতায় সমস্যা হলো, দূষণের উৎসগুলো প্রতিদিনই নতুন করে সক্রিয় থাকে। নির্মাণকাজ, সড়কের ধুলা, ভারী যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্প নির্গমন এবং আশপাশের ইটভাটার প্রভাব বৃষ্টি থামার পর দ্রুত আবার বাতাসে ফিরে আসে। ফলে দুই-এক দিনের বৃষ্টিতে উন্নতি হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এই কারণেই ২৯ এপ্রিলের তুলনায় ৩ মে ও ৪ মে আবার ঢাকার বায়ুমান খারাপের দিকে গেছে। সোমবারের লাইভ ডেটাতেও দেখা গেছে, শহরের একেক এলাকায় একেক মাত্রার দূষণ থাকলেও সামগ্রিকভাবে রাজধানী এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরেই বলে আসছে, বায়ুদূষণ স্ট্রোক, হৃদরোগ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যানসার এবং তীব্র শ্বাসতন্ত্রজনিত সংক্রমণের মতো বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নিউ এজের প্রতিবেদনে WHO-এর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু বায়ুদূষণ-সম্পর্কিত অসুস্থতার সঙ্গে যুক্ত। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এই ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে থাকে।
আজকের পরিস্থিতিতে সংবেদনশীল গোষ্ঠীর মানুষের জন্য মাস্ক ব্যবহার, দীর্ঘ সময় বাইরে না থাকা, বাইরের ব্যায়াম এড়িয়ে চলা এবং ঘরের জানালা বন্ধ রাখা-এসব পরামর্শ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আইকিউএয়ারের স্বাস্থ্য-পরামর্শেও sensitive groups-কে outdoor exercise কমাতে এবং খোলা জানালা সীমিত রাখতে বলা হয়েছে।
আমাদের এখন কী করণীয়?
ঢাকার বায়ুদূষণ সামাল দিতে শুধু আবহাওয়া বা মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে লাভ নেই। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতি। নির্মাণসাইটে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, পুরোনো গাড়ির নির্গমন কমানো, পরিষ্কার জ্বালানিতে যাওয়া, নগর সবুজায়ন বাড়ানো, শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং ইটভাটা ব্যবস্থার সংস্কার-এসব ছাড়া স্থায়ী সমাধান কঠিন। আইকিউএয়ার ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবারই বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোতে দূষণ কমাতে জ্বালানি, পরিবহন ও নগরব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার।