{{ news.section.title }}
তনুর পোশাকে মিলল আরেকজনের রক্ত
কুমিল্লার আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের পর সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষায় তনুর পোশাকে তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর অস্তিত্ব পাওয়ার তথ্য আগে জানানো হয়েছিল। এবার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একই পোশাক থেকে আরেকজনের রক্তের আলামতও শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে তনুর পোশাক থেকে পাওয়া ডিএনএ নমুনার সংখ্যা দাঁড়াল চারজনে।
রোববার রাতে মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সম্প্রতি সিআইডির কাছে চিঠি দিয়ে তনুর পোশাকে পাওয়া নমুনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল। প্রায় এক মাস আগে তাকে জানানো হয়, তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর পাশাপাশি তনুর পোশাকে আরেকজনের রক্তের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, এ নিয়ে সন্দেহভাজনের সংখ্যা চারজনে দাঁড়িয়েছে এবং মামলাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট এই তথ্য এখনো মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। ডিএনএ নমুনা পাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অপরাধী-এমন সিদ্ধান্ত আদালতের রায়ের আগে দেওয়া যায় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন সন্দেহভাজনদের নমুনার সঙ্গে আলামতের মিল খুঁজে দেখছে। প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সন্দেহভাজন হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনা তনুর পোশাক থেকে পাওয়া আলামতের সঙ্গে মেলানো হচ্ছে; তবে সোমবার পর্যন্ত পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়নি।
সোহাগী জাহান তনু ছিলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে প্রাইভেট পড়াতে গিয়ে নিখোঁজ হন তিনি। পরে সেনানিবাসের ভেতরে পাওয়ার হাউস এলাকার কাছে একটি ঝোপ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন ২১ মার্চ তার বাবা, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক ইয়ার হোসেন, কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
হত্যাকাণ্ডের পর শুরু থেকেই মামলাটি দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। প্রথমে থানা-পুলিশ, পরে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা এবং এরপর সিআইডি মামলাটির তদন্ত করে। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও কোনো অভিযোগপত্র দাখিল করা যায়নি। ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলার তদন্তভার পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দ্য ডেইলি স্টারের ২০২০ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, চার বছরের বেশি সময় তদন্ত করেও সিআইডি অভিযোগপত্র দিতে পারেনি; তাদের বড় অগ্রগতি ছিল তনুর পোশাক থেকে পাওয়া ডিএনএ আলামত শনাক্ত করা।
মামলাটির শুরুতে ময়নাতদন্ত নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা যায়নি বলে জানায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ। পরে আদালতের নির্দেশে লাশ কবর থেকে তুলে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত করা হয়। ২০১৬ সালের ১২ জুন দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও মৃত্যুর কারণ নির্দিষ্ট করে বলা যায়নি। তবে একই সময়ে সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় বলে গণমাধ্যমে জানানো হয়েছিল।
২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি জানায়, তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষায় তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়া গেছে। এরপর তনুর মায়ের সন্দেহ করা তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা সেনানিবাসে সিআইডির একটি দল জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে ওই সময় তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। নতুন তথ্য অনুযায়ী, সেই তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর পাশাপাশি পোশাকে আরেকজনের রক্তের অস্তিত্বও ছিল, যা তদন্তকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে মামলাটির তদন্তে নতুন গতি দেখা যাচ্ছে। গত এপ্রিল মাসে এ মামলায় সাবেক সেনা সদস্য হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, প্রায় ১০ বছর পর তনু হত্যা মামলায় একজন সাবেক সেনা সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে দেখার প্রক্রিয়া চলছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তনুর পোশাকে পাওয়া চারটি আলাদা নমুনা মামলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক আলামত। এর মধ্যে তিনটি শুক্রাণুর নমুনা এবং একটি রক্তের আলামত। এসব নমুনার সঙ্গে সন্দেহভাজনদের ডিএনএ মিললে তদন্তে বড় অগ্রগতি আসতে পারে। তবে এ ধরনের ফরেনসিক প্রমাণ আদালতে গ্রহণযোগ্য করতে নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরীক্ষাগারের প্রক্রিয়া এবং মিলের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-সবকিছু যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
তনু হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিচার দাবিতে আন্দোলন হয়। দীর্ঘ প্রায় এক দশক পরও মামলার রহস্য পুরোপুরি উদঘাটন না হওয়ায় তনুর পরিবার বারবার হতাশা প্রকাশ করেছে। দ্য ডেইলি স্টারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তনুর পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা ও বিচার না পাওয়ার বেদনার কথাও উঠে এসেছে।