{{ news.section.title }}
ধর্ষণ মামলায় বিনাদোষে জেল খাটলেন ইমাম, ডিএনএ পরীক্ষায় ধরা আসল অভিযুক্ত
ফেনীর পরশুরামে এক কিশোরীকে ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্ত ইমাম মোজাফফর আহমদ (২৫) অব্যাহতি পেয়েছেন। ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষায় ওই কিশোরীর জন্ম দেওয়া শিশুর সঙ্গে মোজাফফরের ডিএনএর কোনো মিল পাওয়া যায়নি। পরে তদন্তে উঠে আসে, শিশুটির জৈবিক পিতা কিশোরীর আপন বড় ভাই মোরশেদ। এ ঘটনায় পুলিশ মোজাফফরকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে মোরশেদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।
ঘটনাটি ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের। পুলিশ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে মক্তবের পাঠ শেষ করে ওই কিশোরী মক্তবে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। প্রায় পাঁচ বছর পর সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে এবং পরে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর কিশোরীর পরিবার তার সাবেক মক্তব শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করে।
মামলার শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন মোজাফফর। তিনি দাবি করেন, ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে অভিযোগ ওঠার পর সামাজিকভাবে তিনি হেনস্তার শিকার হন। একপর্যায়ে মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরিও হারান তিনি।
মোজাফফরের দাবি, মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর তিনি ফেনীর আদালতে যান। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণ থেকে গ্রামের কয়েকজন ব্যক্তি ও কিশোরীর মা তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। পরে তিনি এক মাস দুই দিন কারাভোগ করেন। ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর জামিনে বের হয়ে তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যান।
আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হন মোজাফফর। মামলার খরচ জোগাতে বাড়ির পাশের ৫ শতক জমি বিক্রি করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সামাজিকভাবে অপমান ও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় পার করতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর অভিযুক্ত মোজাফফরকে ঢাকার মালিবাগে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। একই সঙ্গে কিশোরীর সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি পরশুরাম মডেল থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক জাহিদুল ইসলামের কাছে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পরীক্ষায় ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষের বীর্যের উপাদান শনাক্ত হয়নি। ফলে ওই নমুনার সঙ্গে মোজাফফরের ডিএনএ প্রোফাইল তুলনা করে মতামত দেওয়া সম্ভব হয়নি। এরপর কিশোরী ও তার নবজাতক সন্তানের জৈবিক পিতা নির্ধারণে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আদালতে আবেদন করা হয়।
ফরেনসিক প্রতিবেদনের পর পুলিশ ঘটনাটি আরও গভীরভাবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে কিশোরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে জানায়, তার আপন বড় ভাই মোরশেদই তাকে ধর্ষণ করেছে। পুলিশ বলছে, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে এবং মোরশেদকে রক্ষা করতে পরিবারটি মোজাফফরকে মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করে।
পরে ২০২৫ সালের ১৯ মে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে তার বড় ভাই মোরশেদকে (২২) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মোরশেদ পরিবারের অগোচরে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন। পরদিন ২০ মে আদালতে ১৬৪ ধারায় তিনি জবানবন্দি দেন।
এরপর আদালতের নির্দেশে কিশোরী, তার নবজাতক কন্যাসন্তান এবং অভিযুক্ত মোরশেদের ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট তাদের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকার পুলিশের ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। ৯ আগস্ট পাওয়া ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শিশুটির সঙ্গে মোরশেদের ডিএনএ নমুনার মিল পাওয়া গেছে।
ডিএনএ পরীক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ডিএনএ পরীক্ষায় শিশুটির জৈবিক পিতা হিসেবে মোরশেদের সঙ্গে ৯৯.৯৯ শতাংশ মিল পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করা হয়, মোজাফফর ওই কিশোরীর গর্ভজাত সন্তানের জৈবিক পিতা নন।
সবশেষ গত ১৭ এপ্রিল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) শরীফ হোসেন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(১) ধারায় আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তাই তাকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতির আবেদন করা হয়। অন্যদিকে গ্রেপ্তার আসামি মোরশেদের বিরুদ্ধে একই ধারায় অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। গ্রেপ্তারের পর থেকে মোরশেদ ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন।
মামলা থেকে অব্যাহতির নথি হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন মোজাফফর আহমদ। তিনি বলেন, অবশেষে সত্যের জয় হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি সামাজিক ও পারিবারিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারিয়েছেন। মামলার খরচ চালাতে জমি বিক্রি করতে হয়েছে। কারাভোগ, সামাজিক মর্যাদাহানি ও আর্থিক ক্ষতির জন্য তিনি ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
মোজাফফর আরও বলেন, বিভিন্ন সময় মসজিদের ইমাম ও মাদরাসার শিক্ষকদের নানা অপবাদ দিয়ে ফাঁসানোর ঘটনা ঘটে। প্রকৃত সত্য সামনে এলে তার মতো অনেক নিরপরাধ মানুষ রক্ষা পাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মোজাফফর আহমদের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, ঘটনাটি বিরল। তার মক্কেলকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের পরশুরাম উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মুফতি আমিনুল ইসলাম বলেন, মোজাফফর একজন মজলুম ইমাম ও তালেবে ইলম। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ক্ষতিগ্রস্ত এই ইমামের ক্ষতিপূরণ কে দেবে। তাকে মানসিকভাবে সাহস দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ও আইনিভাবে সহযোগিতা করার আহ্বানও জানান তিনি।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ গভীরভাবে তদন্ত করেছে। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর অভিযোগপত্র থেকে মোজাফফরের নাম প্রত্যাহার করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর আপন বড় ভাই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে তদন্তে উঠে এসেছে। নিরপরাধ একজনকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, যা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।