জ্বালানি সংকটে বন্ধ হয়ে গেল স্পিরিট এয়ারলাইনস

জ্বালানি সংকটে বন্ধ হয়ে গেল স্পিরিট এয়ারলাইনস
ছবির ক্যাপশান, স্পিরিট এয়ারলাইনস | ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধের জেরে জেট ফুয়েলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট এবং শেষ মুহূর্তের উদ্ধার-আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় সাশ্রয়ী উড়োজাহাজ সংস্থা স্পিরিট এয়ারলাইনস। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার, ২ মে ২০২৬ থেকে সংস্থাটি সব ফ্লাইট বাতিল করে ধাপে ধাপে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। সংস্থাটি বলেছে, যাত্রীদের টিকিটের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অতি-স্বল্পমূল্যের বিমানসেবার অন্যতম বড় নাম ছিল স্পিরিট। কম ভাড়ার বিনিময়ে আলাদা ব্যাগ, সিট নির্বাচন ও অন্যান্য সেবার জন্য অতিরিক্ত ফি নেওয়ার যে ‘আনবান্ডলড’ মডেল, সেটি মার্কিন বাজারে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে স্পিরিটকে পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে দুর্বল চাহিদা, ঋণের চাপ, ব্যর্থ একীভূতকরণ প্রচেষ্টা, প্রতিযোগিতা এবং অপারেশনাল সমস্যায় সংস্থাটি নাজুক অবস্থায় ছিল। ইরান যুদ্ধের পর জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই সংকট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়।

 

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পিরিটের পুনর্গঠন পরিকল্পনায় ২০২৬ সালে জেট ফুয়েলের দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় ২ দশমিক ২৪ ডলার এবং ২০২৭ সালে ২ দশমিক ১৪ ডলার ধরে হিসাব করা হয়েছিল। কিন্তু এপ্রিলের শেষ দিকে দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় ৪ দশমিক ৫১ ডলারে উঠে যায়। জ্বালানি ব্যয় সাধারণত এয়ারলাইনগুলোর পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ; ফলে এমন মূল্যবৃদ্ধি আগে থেকেই দুর্বল অবস্থায় থাকা স্পিরিটের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে।

 

সংস্থাটি ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রথম দেউলিয়া সুরক্ষার আবেদন করে এবং ২০২৫ সালের মার্চে পুনর্গঠনের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। কিন্তু পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি। পরে ২০২৫ সালের আগস্টে দ্বিতীয়বার Chapter 11 bankruptcy সুরক্ষার আবেদন করে স্পিরিট। শেষ পর্যন্ত নতুন অর্থায়ন ও উদ্ধার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় সংস্থাটি ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

 

স্পিরিটের প্রধান নির্বাহী ডেভ ডেভিস জানিয়েছেন, ব্যবসা চালিয়ে নিতে কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের নতুন অর্থায়ন দরকার ছিল, কিন্তু সেটি সংগ্রহ করা যায়নি। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে এবং যাত্রীরা ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড বা সংশ্লিষ্ট বুকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া অনুসরণ করবেন। এবিসি নিউজ জানিয়েছে, কোম্পানিটি “orderly wind-down” বা ধাপে ধাপে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার কথা বলেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন শেষ মুহূর্তে স্পিরিটকে রক্ষার জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি সম্ভাব্য উদ্ধার সহায়তা নিয়ে আলোচনা করেছিল। তবে ওই আলোচনা সফল হয়নি। পিপল ম্যাগাজিন ও অন্যান্য মার্কিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার সংস্থাটিকে বাঁচাতে সহায়তা বিবেচনা করলেও বন্ডহোল্ডারদের সঙ্গে ঋণ পুনর্গঠন চুক্তি এবং টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করা যায়নি।

 

মার্কিন পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি জানান, তারা অন্য এয়ারলাইনগুলোর সঙ্গে স্পিরিটের যাত্রীদের সহায়তা, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বুকিং নিয়ে আলোচনা করেছেন। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউনাইটেড, ডেলটা, জেটব্লু, সাউথওয়েস্ট, ফ্রন্টিয়ার, অ্যালিজিয়েন্ট ও আমেরিকান এয়ারলাইনস ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের জন্য সীমিত ভাড়া ও বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা করতে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে স্পিরিট কর্মীদের ভ্রমণ ও চাকরি খোঁজার সহায়তার কথাও আলোচনায় এসেছে।

 

স্পিরিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার কর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে কর্মীসংখ্যা ১৪ হাজার থেকে ১৭ হাজারের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির পাইলট, কেবিন ক্রু, গ্রাউন্ড স্টাফ, মেইনটেন্যান্স কর্মী ও প্রশাসনিক কর্মীরা সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছেন। শ্রমিক সংগঠনগুলো স্পিরিটের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের দুর্বল ব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলেছে এবং কর্মীদের পূর্ণ ক্ষতিপূরণ ও সহায়তার দাবি জানিয়েছে।

 

স্পিরিটের পতনের পেছনে জেটব্লুর সঙ্গে ব্যর্থ একীভূতকরণ প্রচেষ্টাকেও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত জেটব্লু-স্পিরিট একীভূতকরণ আটকে দেয়, কারণ সেটি বাজারে কম ভাড়ার প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। পরে স্পিরিটের পুনরুদ্ধারের পথ আরও সংকুচিত হয়। ফ্রন্টিয়ারের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তিও শেষ পর্যন্ত ফল দেয়নি।

 

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়াকে স্পিরিটের জন্য “শেষ ধাক্কা” হিসেবে দেখা হচ্ছে। টাইম ম্যাগাজিন জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি ব্যয় হঠাৎ ও ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যায়, যা স্বল্পমূল্যের এয়ারলাইনগুলোর ব্যবসায়িক মডেলকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলে। এসব সংস্থা সাধারণত কম ভাড়া দিয়ে বেশি যাত্রী বহনের ওপর নির্ভর করে; ফলে জ্বালানির দাম দ্বিগুণের কাছাকাছি উঠলে তাদের মুনাফা দ্রুত হারিয়ে যায়।

 

বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্পিরিটের পতন শুধু একটি এয়ারলাইনের বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; এটি মার্কিন এভিয়েশন খাতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। স্বল্পমূল্যের এয়ারলাইনগুলো আগে বড় এয়ারলাইনগুলোর ভাড়া কমিয়ে রাখতে চাপ সৃষ্টি করত। এখন স্পিরিট না থাকলে কিছু রুটে যাত্রীদের ভাড়া বাড়তে পারে, বিশেষ করে যেসব শহরে স্পিরিট ছিল কম খরচে ভ্রমণের প্রধান বিকল্প।

 

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পিরিটের পতন দেখিয়ে দিচ্ছে যে ইরান যুদ্ধের জ্বালানি ধাক্কা শুধু তেলবাজার বা গাড়ির পাম্পেই সীমাবদ্ধ নয়; বিমান ভাড়া, কর্মসংস্থান, পর্যটন ও সাধারণ মানুষের ভ্রমণ খরচেও এর প্রভাব পড়ছে। জ্বালানি ব্যয় আরও বাড়লে অন্য দুর্বল স্বল্পমূল্যের এয়ারলাইনগুলোর ওপরও চাপ বাড়তে পারে।

 

স্পিরিট ১৯৮৩ সালে Charter One Airlines নামে যাত্রা শুরু করে। পরে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম পরিচিত বাজেট এয়ারলাইন হয়ে ওঠে। উজ্জ্বল হলুদ রঙের উড়োজাহাজ, কম ভাড়া, বিতর্কিত বিজ্ঞাপন এবং অতিরিক্ত ফি-ভিত্তিক মডেলের জন্য সংস্থাটি একই সঙ্গে জনপ্রিয় ও সমালোচিত ছিল। বহু শিক্ষার্থী, নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবার এবং বাজেট ভ্রমণকারীর কাছে স্পিরিট ছিল সাশ্রয়ী ভ্রমণের বড় ভরসা।

 

তবে শেষ পর্যন্ত কম ভাড়ার মডেল, উচ্চ ঋণ, ব্যর্থ পুনর্গঠন, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং জেট ফুয়েলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি একসঙ্গে সংস্থাটিকে টিকতে দেয়নি। স্পিরিটের বন্ধ হয়ে যাওয়া তাই ইরান যুদ্ধের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অভিঘাতের একটি বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়াল-যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ধাক্কা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের আকাশপথ, যাত্রী ও কর্মসংস্থানে গিয়ে পড়েছে।

 

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


সম্পর্কিত নিউজ