যুক্তরাষ্ট্রের ক্রুজ জাহাজে প্রাণঘাতী হান্টা ভাইরাস আতঙ্ক, কয়েক সপ্তাহ কেউ বুঝতেই পারেনি কেন?

যুক্তরাষ্ট্রের ক্রুজ জাহাজে প্রাণঘাতী হান্টা ভাইরাস আতঙ্ক, কয়েক সপ্তাহ কেউ বুঝতেই পারেনি কেন?
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

উত্তর আমেরিকাভিত্তিক একটি বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজে হান্টাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে রহস্যজনক অসুস্থতা দেখা দেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় প্রাণঘাতী এই ভাইরাস শনাক্ত হয়। এর মধ্যেই কয়েকজন যাত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে Associated Press (AP)।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুরুতে যাত্রীদের মধ্যে জ্বর, শরীর ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও তীব্র ক্লান্তির মতো উপসর্গ দেখা যায়। ক্রুজ কর্তৃপক্ষ প্রথমে এটিকে সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ বা মৌসুমি ফ্লু হিসেবে ধরে নেয়। ফলে আক্রান্তদের আলাদা করার সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই বড় ধরনের ভুল হয়েছিল।

 

হান্টাভাইরাস সাধারণত ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর মল, মূত্র বা লালার মাধ্যমে ছড়ায়। বিশেষ করে বন্ধ জায়গায় দূষিত বাতাসের মাধ্যমে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের Centers for Disease Control and Prevention (CDC) জানিয়েছে, ভাইরাসটি ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ তৈরি করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা প্রাণঘাতী হয়।

 

AP জানিয়েছে, ক্রুজ জাহাজের একটি স্টোরেজ ও খাদ্য সরবরাহ অংশে ইঁদুরের উপস্থিতির আলামত পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকেই ভাইরাস ছড়াতে শুরু করে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুনাশ কার্যক্রম যথেষ্ট না হওয়ায় সংক্রমণ দ্রুত বিস্তার লাভ করে।

 

যাত্রীদের কয়েকজন জানান, প্রথম সপ্তাহেই অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লেও কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। একজন যাত্রী AP-কে বলেন, “মানুষ কাশি দিচ্ছিল, জ্বরে ভুগছিল, কিন্তু সবাই ভাবছিল এটা সাধারণ ফ্লু।” পরে কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকলে চিকিৎসকদের সন্দেহ হয় এবং বিশেষ পরীক্ষা করা হয়।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হান্টাভাইরাস শনাক্ত করা কঠিন, কারণ শুরুতে এর উপসর্গ অনেকটাই সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণেই দ্রুত শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

ঘটনার পর জাহাজটি নির্দিষ্ট বন্দরে থামিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করা হয়। যাত্রী ও ক্রু সদস্যদের আলাদা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সংক্রমণ আরও ছড়িয়েছে কি না, তা জানতে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা নমুনা পরীক্ষা করছেন। একই সঙ্গে জাহাজটির বিভিন্ন অংশে জীবাণুনাশ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রুজ জাহাজগুলোতে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। করোনা মহামারির পরও অনেক জাহাজে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হান্টাভাইরাসের মতো বিরল কিন্তু প্রাণঘাতী সংক্রমণ দেখিয়ে দিল, বন্ধ পরিবেশে সামান্য অবহেলাও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।

 

CDC যাত্রীদের সতর্ক করে জানিয়েছে, জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা হঠাৎ দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। বিশেষ করে যাঁরা ওই জাহাজে ছিলেন, তাঁদের কয়েক সপ্তাহ স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এদিকে ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিলাসবহুল ক্রুজ ভ্রমণ নিরাপদ কি না, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য নিরাপত্তা প্রটোকল আরও কঠোর করার দাবিও উঠছে।

 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি ক্রুজ জাহাজের সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক ভ্রমণ ব্যবস্থার জন্যও বড় সতর্কবার্তা। দ্রুত শনাক্তকরণ, স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং জরুরি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ