{{ news.section.title }}
তেলের দামে ট্রাম্পের ওপর ক্ষোভে ফুঁসছে ক্যালিফোর্নিয়াবাসী
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম নতুন করে বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছেন ক্যালিফোর্নিয়ার সাধারণ মানুষ। লস অ্যাঞ্জেলেসের পাম্পগুলোতে গ্যাসোলিনের দাম গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে। ফলে গাড়িনির্ভর জীবনযাপনের এই অঙ্গরাজ্যে কর্মজীবী, অবসরপ্রাপ্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন খরচ দ্রুত বেড়ে গেছে। যুদ্ধের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও এখন খোলাখুলি ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি গ্যাস স্টেশনে পিকআপ ট্রাকে তেল ভরতে গিয়ে ২৮ বছর বয়সী রাইডার থমাসের খরচ হয় ১৩০ ডলার। তিনি এএফপিকে বলেন, যুদ্ধের আগে একই ট্যাংক ভরতে তার প্রায় ৩০ ডলার কম খরচ হতো। তেলের দাম বাড়া নিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ, তবে কেন দাম বাড়ছে-তা নিয়ে আরও বেশি রাগান্বিত। তার ভাষায়, “এই যুদ্ধের কোনো দরকার ছিল না। এটি ইরাক আক্রমণের মতো, যেখানে শেষ পর্যন্ত কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায়নি।”
এই ক্ষোভ শুধু একজন চালকের নয়। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, যুদ্ধের লক্ষ্য পরিষ্কার নয়, অথচ এর সরাসরি খরচ পড়ছে জ্বালানি পাম্পে, খাদ্যবাজারে এবং মাসিক বাজেটে।
চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে গ্যাসোলিন
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রিফাইনারিতে উৎপাদন সমস্যা-সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এপ্রিলের শেষ দিকে দেশটিতে গড় গ্যাসোলিনের দাম ছিল প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ১৮ ডলার, যা ফেব্রুয়ারির শেষ দিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ১৯ ডলার বেশি।
ইনভেস্টোপিডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গড় দাম প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ১৮ ডলারে ওঠে, যা সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তখন ২৭টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে গড় দাম ৪ ডলারের ওপরে চলে যায়। দেশজুড়ে দাম বাড়লেও ক্যালিফোর্নিয়া সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবস্থানে থাকে।
দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়ায় গ্যাসোলিনের গড় দাম গ্যালনপ্রতি ৬ দশমিক ০৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। জাতীয় গড় ৪ দশমিক ৩৯ ডলার পর্যন্ত ওঠে এবং ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম মোটামুটি ৪৪ শতাংশ বেড়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় দাম এত বেশি কেন
ক্যালিফোর্নিয়ায় তেলের দাম সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের অন্য অঙ্গরাজ্যগুলোর তুলনায় বেশি। এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে-উচ্চ জ্বালানি কর, কঠোর পরিবেশগত মান, বিশেষ ধরনের জ্বালানি মিশ্রণ, সীমিত রিফাইনারি সক্ষমতা এবং অন্য অঙ্গরাজ্যের পাইপলাইন নেটওয়ার্ক থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্নতা। সান ফ্রান্সিসকো ক্রনিকলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ার বিশেষ fuel blend এবং রিফাইনারি-নির্ভর বাজারের কারণে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন হলেও দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে ইরান যুদ্ধের বৈশ্বিক অভিঘাত। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। সেই পথ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। জাহাজ চলাচল, বীমা ব্যয় এবং সরবরাহ ঝুঁকি বাড়ায় জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব
জ্বালানি তেলের দামের এই উল্লম্ফন শুধু গাড়ির ট্যাংক ভরার খরচ বাড়াচ্ছে না; এর প্রভাব পড়ছে বাজারের প্রায় সব পণ্যে। রাইডার থমাসের মতো চালকেরা আশঙ্কা করছেন, পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্য, পোশাক ও দৈনন্দিন পণ্যের দামও আরও বাড়বে। স্ট্রেইটস টাইমসের এএফপি-ভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ায় পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১ দশমিক ৫৯ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা যুদ্ধের আগে প্রায় ১ দশমিক ২০ ডলার ছিল।
এএফপির প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, পাম্পে দাঁড়ানো অনেকেই এখন গাড়ি ব্যবহার কমানোর কথা ভাবছেন। ৭৩ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ফ্লো জানান, পেনশনের টাকা দিয়ে ঘরভাড়া পরিশোধের পর হাতে খুব সামান্য অর্থ থাকে। চড়া জ্বালানি দামের কারণে তাকে এখন গাড়ি চালানো কমাতে হচ্ছে। তার কথায়, জীবন আগে থেকেই কঠিন ছিল, এখন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে
ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে সামরিক পদক্ষেপ জরুরি ছিল। তবে বিরোধী রাজনীতিক, সাধারণ ভোটার ও অনেক বিশ্লেষকের প্রশ্ন-যুদ্ধের উদ্দেশ্য কতটা স্পষ্ট, আর এর মূল্য কতটা বহন করতে হচ্ছে মার্কিন জনগণকে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে; প্রতিরক্ষা দপ্তরকে যুদ্ধের খরচ, কংগ্রেসের অনুমোদন এবং সংঘাতের লক্ষ্য নিয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে।
দ্য টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে পেন্টাগনের হিসাবও বিতর্কের মুখে। প্রশাসন সামরিক ব্যয়কে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কে দেখালেও সমালোচকেরা বলছেন, প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়-জ্বালানি, সার, খাদ্য ও পরিবারগুলোর মাসিক খরচেও দেখা যাচ্ছে।
তেল কোম্পানির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
সব ক্ষোভ শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের দিকে নয়। লস অ্যাঞ্জেলেসের পাম্পে দাঁড়ানো ক্যামেরাপারসন ডেভিড চাভেজের মতো কেউ কেউ মনে করেন, তেল কোম্পানিগুলো সংকটের সুযোগ নিয়ে দাম বাড়াচ্ছে। চাভেজ আগে ডেমোক্র্যাট সমর্থক ছিলেন, পরে অভিবাসন ও অর্থনীতি ইস্যুতে ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাম্পকে ভোট দেন। কিন্তু বর্তমান জ্বালানি দামের ধাক্কায় তিনিও হতাশ। এএফপি-ভিত্তিক প্রতিবেদনে তার মতো কয়েকজন ভোটারের বিভক্ত মনোভাবও উঠে এসেছে-তারা বাইডেন প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন, কিন্তু এখন ট্রাম্পের যুদ্ধের অর্থনৈতিক ফল নিয়ে অস্বস্তিতে আছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যালিফোর্নিয়ার জ্বালানি বাজারে তেল কোম্পানির মুনাফা, রিফাইনারি সক্ষমতা, কর এবং বৈশ্বিক দাম-সবকিছু মিলিয়ে দাম তৈরি হয়। তাই শুধু একটি কারণকে দায়ী করা সহজ হলেও বাস্তবতা অনেক জটিল। তবে সাধারণ ভোক্তার কাছে এই জটিল ব্যাখ্যার চেয়ে পাম্পে পরিশোধ করা অতিরিক্ত ডলারই বেশি বাস্তব।
ভ্রমণ পরিকল্পনাতেও প্রভাব
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, জ্বালানি দামের কারণে অনেক মার্কিন নাগরিক তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা বদলাচ্ছেন বা কমাচ্ছেন। যদিও অনেকেই এখনো গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিল করছেন না, কিন্তু দীর্ঘ দূরত্বে গাড়ি চালানো, কাজের যাতায়াত এবং ছুটির ভ্রমণে খরচ হিসাব নতুন করে করতে হচ্ছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার মতো অঙ্গরাজ্যে, যেখানে বহু মানুষ কাজের জন্য প্রতিদিন দীর্ঘ পথ গাড়ি চালান, সেখানে গ্যালনপ্রতি ৬ ডলারের বেশি দাম সরাসরি পারিবারিক বাজেটে আঘাত করছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষকে খাবার, ভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা ও জ্বালানির মধ্যে কঠিন অগ্রাধিকার ঠিক করতে হচ্ছে।
সামনে কী হতে পারে
জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র অচলাবস্থা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, রিফাইনারি উৎপাদন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ-এই চারটি বিষয়ের ওপর আগামী সপ্তাহগুলোর দাম নির্ভর করবে। যদি হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হয় এবং অপরিশোধিত তেলের দাম উঁচুতে থাকে, তাহলে গ্যাসোলিনের দাম আরও কিছুদিন উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। সান ফ্রান্সিসকো ক্রনিকলও সতর্ক করেছে, উত্তেজনা কমলেও ক্যালিফোর্নিয়ার বাজারে দাম দ্রুত কমবে-এমন নিশ্চয়তা নেই।
ক্যালিফোর্নিয়ার পাম্পে যে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে, তা শুধু জ্বালানির দাম নিয়ে নয়; এটি ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক বৈধতা, ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, তেল কোম্পানির ভূমিকা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপের সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া। গ্যাসোলিনের দাম ৬ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় বহু চালকের কাছে যুদ্ধ এখন দূরের কোনো ভূরাজনীতি নয়-এটি তাদের পকেট, বাজার খরচ এবং প্রতিদিনের জীবনযাত্রার সরাসরি সংকট।
তথ্যসূত্র: এএফপি