{{ news.section.title }}
কঙ্গোতে ইবোলা আতঙ্ক, কতটা ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য?
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে ইবোলা ভাইরাসের নতুন প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণ এখন প্রতিবেশী উগান্ডাতেও পৌঁছেছে।
পরিস্থিতির গুরুতরতা বিবেচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডিআর কঙ্গো ও উগান্ডার এই ইবোলা প্রাদুর্ভাবকে “আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা” ঘোষণা করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বৈশ্বিক মহামারির মতো পরিস্থিতি নয়; ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ডিআর কঙ্গো ও সীমান্তবর্তী দেশগুলোর জন্য।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ১৬ মে ২০২৬ পর্যন্ত ডিআর কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশে ৮টি ল্যাব-নিশ্চিত সংক্রমণ, ২৪৬টি সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং ৮০টি সন্দেহভাজন মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে বুনিয়া, রওয়ামপারা ও মংবওয়ালু স্বাস্থ্য অঞ্চল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক নমুনায় উচ্চ পজিটিভিটির হার এবং সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রকৃত সংক্রমণ আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি ইবোলার তুলনামূলক বিরল বান্ডিবুগিও ধরন বা Bundibugyo virus disease-BVD দিয়ে হয়েছে। এই ধরনটি প্রথম ২০০৭ সালে উগান্ডার বান্ডিবুগিও জেলায় শনাক্ত হয়। এর আগে ২০০৭ ও ২০১২ সালে এই ধরনে সংক্রমণ দেখা যায়। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিআর কঙ্গো ও উগান্ডায় ২০টির বেশি ইবোলা প্রাদুর্ভাব হলেও বান্ডিবুগিও ধরনের সংক্রমণ এবারসহ মাত্র তৃতীয়বারের মতো বড় আকারে দেখা যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ইবোলার জাইর ধরন মোকাবিলায় অনুমোদিত টিকা ও চিকিৎসা থাকলেও বান্ডিবুগিও ধরনের জন্য এখনো অনুমোদিত নির্দিষ্ট টিকা বা চিকিৎসা নেই। এ কারণে সংক্রমণ শনাক্তকরণ, রোগী আলাদা করা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ-এসব ব্যবস্থাই এখন প্রধান ভরসা। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ধরনটি প্রচলিত পরীক্ষা ও বিদ্যমান টিকা ব্যবস্থাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
ডিআর কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রাদুর্ভাবের সম্ভাব্য শুরুর ঘটনা হিসেবে একজন নার্সের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রওয়ামপারা স্বাস্থ্য অঞ্চলের ওই নার্স জ্বর, রক্তক্ষরণ, বমি ও তীব্র দুর্বলতার মতো উপসর্গে আক্রান্ত হওয়ার পর মারা যান। পরে ল্যাব পরীক্ষায় বান্ডিবুগিও ধরন শনাক্ত হয়।
সংক্রমণটি এমন এক অঞ্চলে ছড়িয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা ও সীমান্তবর্তী চলাচলের সমস্যা রয়েছে। ইতুরি প্রদেশে মিলিশিয়া সংঘাত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের চাপ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে রেখেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সহিংসতা, উচ্চ জনচলাচল ও অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে।
উগান্ডাতেও সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় আঞ্চলিক ঝুঁকি বেড়েছে। পিবিএস নিউজআওয়ারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কঙ্গো থেকে আসা এক ব্যক্তি উগান্ডার রাজধানী কাম্পালার একটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর মারা যান এবং পরে তাঁর দেহে ইবোলা শনাক্ত হয়। আল জাজিরা জানিয়েছে, ডিআর কঙ্গোর বাইরে সন্দেহভাজন সংক্রমণের মধ্যে উগান্ডার ঘটনাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিআর কঙ্গোর এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সমন্বয় জরুরি। সায়েন্স মিডিয়া সেন্টারে প্রকাশিত বিশেষজ্ঞ মতামতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আমান্ডা রোজেক বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল উল্লেখ করেছেন। একই আলোচনায় লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ড. ড্যানিয়েলা মান্নো বলেন, ডিআর কঙ্গোর ইবোলা মোকাবিলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে এবং আগের তুলনায় দেশটির প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বেড়েছে।
ইবোলা সাধারণত বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে ফলখেকো বাদুড়ের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। এরপর আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, বমি, ডায়রিয়া, ঘাম, লালা, মৃতদেহ বা শরীরের অন্যান্য তরলের সংস্পর্শে এলে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবারের সদস্য এবং মৃত ব্যক্তির দাফন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। ভাইরাস শরীরে ঢোকার পর সাধারণত ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়।
প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ ফ্লু বা ম্যালেরিয়ার মতো মনে হতে পারে-জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, গলা ব্যথা, ক্লান্তি ও দুর্বলতা। পরে বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা, পানিশূন্যতা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা কমে যাওয়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক রক্তক্ষরণ দেখা দিতে পারে। ডব্লিউএইচওর আফ্রিকা অঞ্চলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবে রোগীরা জ্বর, শরীরব্যথা, দুর্বলতা, বমি এবং কিছু ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণের উপসর্গ নিয়ে দ্রুত অবনতির মুখে পড়েছেন।
চিকিৎসায় এখন প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সহায়ক পরিচর্যায়। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত রোগী শনাক্ত, আলাদা রাখা, পর্যাপ্ত তরল ও ইলেক্ট্রোলাইট দেওয়া, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, অক্সিজেন বা প্রয়োজনীয় সহায়ক চিকিৎসা এবং জটিলতা দেখা দিলে তা দ্রুত সামাল দেওয়া। নির্দিষ্ট অনুমোদিত ওষুধ না থাকায় প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনাই মৃত্যুঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডিআর কঙ্গোর জন্য ইবোলা নতুন নয়। ১৯৭৬ সালে দেশটিতে প্রথম ইবোলা শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এটি দেশটির ১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব বলে জানিয়েছে রয়টার্স ও ডব্লিউএইচও–সম্পর্কিত প্রতিবেদন। তবে এবারের প্রাদুর্ভাবকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক করে তুলেছে তিনটি বিষয়-বিরল বান্ডিবুগিও ধরন, অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসার অভাব এবং সংঘাতকবলিত এলাকায় দেরিতে শনাক্ত হওয়া সংক্রমণ।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো এখন সীমান্ত নজরদারি, রোগী শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সচেতন করার ওপর জোর দিচ্ছে। আফ্রিকা সিডিসি, ডব্লিউএইচও এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদার ইতোমধ্যে ডিআর কঙ্গো ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসিও ডিআর কঙ্গো ও উগান্ডার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তার কথা জানিয়েছে।