{{ news.section.title }}
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি অবস্থা ঘোষণা
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও প্রতিবেশী উগান্ডায় ইবোলা ভাইরাসের বিরল ‘বুন্দিবুগিও’ ধরন ছড়িয়ে পড়ায় এটিকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, পরিস্থিতি গুরুতর হলেও এটি এখনো বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ১৬ মে পর্যন্ত ডিআর কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশে ৮টি ল্যাব-নিশ্চিত সংক্রমণ, ২৪৬টি সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং ৮০টি সন্দেহভাজন মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সংক্রমণ ছড়িয়েছে অন্তত তিনটি স্বাস্থ্য অঞ্চলে-বুনিয়া, রামপারা ও মংবওয়ালুতে।
আফ্রিকা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বা আফ্রিকা সিডিসি জানিয়েছে, আক্রান্তদের বড় অংশই স্বর্ণখনি অধ্যুষিত মংবওয়ালু ও রামপারা অঞ্চলের বাসিন্দা। সংস্থাটি বলছে, এসব তথ্য এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের এবং ল্যাব পরীক্ষা, রোগীর তালিকা সমন্বয়, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত ও মহামারি তদন্তের মাধ্যমে সংখ্যা যাচাই করা হচ্ছে।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এটি ইবোলার তুলনামূলক বিরল বুন্দিবুগিও ধরন দিয়ে ঘটেছে। ডব্লিউএইচও ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনটির জন্য এখনো অনুমোদিত নির্দিষ্ট টিকা বা চিকিৎসা নেই; বিদ্যমান ইবোলা টিকা ও চিকিৎসা মূলত জাইর ইবোলা ধরনকে কেন্দ্র করে তৈরি।
উগান্ডাতেও সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় আঞ্চলিক ঝুঁকি বেড়েছে। উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ডিআর কঙ্গো থেকে আসা এক রোগীর শরীরে ইবোলা শনাক্ত হয়; ওই রোগী ১৪ মে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে মারা যান। সংক্রমণটি বুন্দিবুগিও ধরন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, জরুরি অবস্থা ঘোষণার উদ্দেশ্য হলো দ্রুত আন্তর্জাতিক সহায়তা, নজরদারি, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, রোগী শনাক্তকরণ ও সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা। সংস্থাটি বলছে, প্রাথমিক নমুনায় উচ্চ পজিটিভিটির হার এবং সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রকৃত সংক্রমণ আরও বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিআর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা ও জনচলাচলের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সহিংসতা, উচ্চ জনচলাচল ও দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে।
ডিআর কঙ্গোর জন্য ইবোলা নতুন নয়। ১৯৭৬ সালে দেশটিতে প্রথম ইবোলা শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এটি দেশটির ১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব বলে জানিয়েছে রয়টার্স। তবে এবারের প্রাদুর্ভাব আলাদা, কারণ এটি বিরল বুন্দিবুগিও ধরন, যার বিরুদ্ধে অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।
ইবোলা সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, বমি, ডায়রিয়া, লালা, ঘাম, মৃতদেহ বা শরীরের অন্যান্য তরলের সংস্পর্শে ছড়ায়। স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবারের সদস্য এবং দাফন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর সাধারণত ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
রোগের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিব্যথা, ক্লান্তি ও গলা ব্যথার মতো সাধারণ উপসর্গ দিয়ে শুরু হয়। পরে বমি, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা কমে যাওয়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ দেখা দিতে পারে।বর্তমানে চিকিৎসার মূল ভরসা হলো দ্রুত শনাক্তকরণ, রোগীকে আলাদা রাখা, তরল ও ইলেক্ট্রোলাইট সরবরাহ, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নজরদারি। নির্দিষ্ট অনুমোদিত ওষুধ না থাকায় প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনাই মৃত্যুঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
ডব্লিউএইচও, আফ্রিকা সিডিসি ও আন্তর্জাতিক অংশীদাররা এখন ডিআর কঙ্গো, উগান্ডা এবং সীমান্তবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াচ্ছে। আফ্রিকা সিডিসি দক্ষিণ সুদানের সঙ্গেও সীমান্ত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য সমন্বয় করছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসিও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ডিআর কঙ্গো ও উগান্ডা সরকারকে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে সংক্রমণ শনাক্ত, নজরদারি ও প্রতিরোধ কার্যক্রমে সহায়তা করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এখনো কোভিড-১৯ ধরনের বৈশ্বিক মহামারির মতো পরিস্থিতি নয়। ইবোলা সাধারণত বাতাসে সহজে ছড়ায় না; ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ ও শরীরের তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। তবে সংঘাতপূর্ণ এলাকা, খনি অঞ্চলের জনচলাচল, সীমান্ত পারাপার এবং টিকার অভাব এই প্রাদুর্ভাবকে আঞ্চলিকভাবে বড় ঝুঁকিতে পরিণত করেছে।