খারতুমে আরএসএফের ড্রোন হামলায় ৫ বেসামরিক নিহত

খারতুমে আরএসএফের ড্রোন হামলায় ৫ বেসামরিক নিহত
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

সুদানের রাজধানী খারতুমের বৃহত্তর এলাকায় প্যারামিলিটারি বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) ড্রোন হামলায় পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। শনিবার সকালে ওমদুরমানের দক্ষিণাঞ্চলীয় আল-জামুইয়া ট্রায়াঙ্গল সড়কে একটি বেসামরিক গাড়ি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে সুদানের স্বাধীন আইনি সংগঠন ইমারজেন্সি লয়ার্স। সংগঠনটি যুদ্ধের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তা ও নথিভুক্ত করার কাজ করে।

ইমারজেন্সি লয়ার্সের তথ্য অনুযায়ী, হামলার শিকার গাড়িটি হোয়াইট নাইল রাজ্যের শেখ আল-সিদ্দিক এলাকা থেকে আসছিল। ড্রোনটি গাড়িটিতে আঘাত করলে ভেতরে থাকা পাঁচজনই নিহত হন। সংগঠনটি হামলার জন্য আরএসএফকে দায়ী করে বলেছে, এটি বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে চলমান হামলার ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

 

এটি এক সপ্তাহের মধ্যে রাজধানী অঞ্চলে দ্বিতীয় ড্রোন হামলা বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। সুদানের সেনাবাহিনী গত বছর খারতুমের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের পর রাজধানী অঞ্চলে কয়েক মাস তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি ছিল। তবে সাম্প্রতিক হামলাগুলো দেখাচ্ছে, আরএসএফ আবারও রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ড্রোন কার্যক্রম বাড়াতে পারে। সুদান ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন দিনে খারতুমের দক্ষিণে জাবাল আওলিয়া এলাকাতেও কয়েকটি স্থাপনা ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

 

সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে গৃহযুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের শুরুতে রাজধানী খারতুম ছিল সংঘর্ষের অন্যতম কেন্দ্র। পরে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে দারফুর, কর্ডোফান, হোয়াইট নাইলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে বেসামরিক নাগরিক, হাসপাতাল, বাজার, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি সরবরাহ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ড্রোন হামলা যুদ্ধের একটি বড় অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।

 

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সুদানে ড্রোন হামলায় প্রায় ৭০০ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ বলছে, দেশজুড়ে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় ড্রোন হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে দারফুর ও কর্ডোফান অঞ্চলে এ ধরনের হামলার মাত্রা ভয়াবহভাবে বেড়েছে।

 

এর আগে গত মার্চে দারফুর ও উত্তর কর্ডোফানে দুটি আলাদা ড্রোন হামলায় অন্তত ২৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। দারফুরের সারাফ ওমরা এলাকার একটি বাজারে হামলায় ২২ জন নিহত হন, আহত হন ১৭ জন। আর উত্তর কর্ডোফানে একটি বেসামরিক ট্রাকে হামলায় ছয়জন নিহত হন। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকে মধ্য মার্চ পর্যন্ত ড্রোন হামলায় পাঁচ শতাধিক বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল; এপ্রিলের মাঝামাঝি জাতিসংঘের হিসাবে সেই সংখ্যা প্রায় ৭০০-তে পৌঁছায়।

 

স্বাস্থ্য অবকাঠামোও ড্রোন হামলা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। গত মাসে হোয়াইট নাইল প্রদেশের আল-জাবালাইন হাসপাতালে আরএসএফের ড্রোন হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হন বলে জানিয়েছিল মেডিকেল দাতব্য সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস। নিহতদের মধ্যে চিকিৎসাকর্মী ও হাসপাতাল প্রশাসনের কর্মকর্তারাও ছিলেন। ওই হামলায় হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার ও মাতৃস্বাস্থ্য বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

খারতুমে সাম্প্রতিক হামলা তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সুদানের যুদ্ধে ড্রোন ব্যবহারের দ্রুত বিস্তার এবং বেসামরিক মানুষের ওপর বাড়তে থাকা ঝুঁকির আরেকটি উদাহরণ। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, গাড়ি, বাজার, হাসপাতাল বা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ড্রোন হামলা বেসামরিক মানুষের জীবনকে আরও অনিরাপদ করে তুলছে। যুদ্ধের পক্ষগুলো সামরিক লক্ষ্যবস্তু ও বেসামরিক স্থাপনার মধ্যে পার্থক্য না করলে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের দায় এড়ানো যাবে না।

 

সুদানের যুদ্ধ ইতোমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ ও সহায়তা সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত, বহু এলাকা খাদ্যসংকটের মুখে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পথে। দারফুরে শিশুদের পরিস্থিতি নিয়ে ইউনিসেফ সম্প্রতি বিরল ‘চাইল্ড অ্যালার্ট’ জারি করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, সহিংসতা, ক্ষুধা, রোগ, বাস্তুচ্যুতি ও মানসিক আঘাতে শিশুরা চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

 

রাজধানী খারতুমে কয়েক মাসের তুলনামূলক শান্তির পর নতুন করে ড্রোন হামলা শুরু হওয়া স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। যুদ্ধের বিস্তার, ড্রোনের সহজলভ্যতা এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলার প্রবণতা দেখাচ্ছে, সুদানে সংঘাত এখন আরও অনিয়ন্ত্রিত ও বিধ্বংসী রূপ নিচ্ছে।

তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি


সম্পর্কিত নিউজ