নেইমার কি ব্রাজিলের জন্য বিশ্বকাপে ‘শ্বেত হস্তী’ হয়ে উঠছেন?

নেইমার কি ব্রাজিলের জন্য বিশ্বকাপে ‘শ্বেত হস্তী’ হয়ে উঠছেন?
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে ব্রাজিলের চূড়ান্ত দল ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে একটি নাম-নেইমার জুনিয়র। দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকা, চোটের সঙ্গে লড়াই, ক্লাব ফুটবলে অনিয়মিত ছন্দ এবং বয়স-সবকিছু মিলিয়ে তাকে বিশ্বকাপ দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে ব্রাজিলের ফুটবল মহলে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।

কার্লো আনচেলত্তির ঘোষিত ২৬ সদস্যের দলে নেইমারের অন্তর্ভুক্তি অনেকের কাছে আবেগের সিদ্ধান্ত, আবার অনেকের কাছে তা অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার বাস্তব স্বীকৃতি। ৩৪ বছর বয়সী নেইমার ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা; জাতীয় দলের হয়ে তার গোল ৭৯টি। তিনি ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ সালের পর এবার চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন।

 

তবে বিতর্কের কারণও কম নয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গুরুতর হাঁটুর চোটের পর নেইমার দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন। আল হিলালে সময়টা প্রত্যাশা অনুযায়ী কাটেনি। পরে সান্তোসে ফেরার পরও পুরোনো নেইমারের গতি, ধারাবাহিকতা ও ম্যাচ ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এই বিশ্বকাপ চক্রে তিনি ব্রাজিলের হয়ে খুব কমই খেলেছেন। ফলে সমালোচকদের প্রশ্ন-এমন একজন ফুটবলারকে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে নেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত?

 

সমালোচকদের মতে, নেইমারের নাম ব্রাজিল দলে বড় হলেও তার বর্তমান মাঠের প্রভাব নিয়ে সংশয় আছে। তিনি কি মূল একাদশে থাকবেন, নাকি বেঞ্চ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবহার করা হবে-এটাই এখন বড় প্রশ্ন। যদি তাকে নিয়মিত খেলানো না হয়, তাহলে কেন একজন তরুণ ও ফর্মে থাকা ফুটবলারের জায়গা নেওয়া হলো-এ প্রশ্নও তুলছেন অনেকে।

 

অন্যদিকে নেইমারের সমর্থকদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, ব্রাজিল দলে প্রতিভার অভাব নেই, কিন্তু চাপের মুহূর্তে দলকে জাগিয়ে তোলার মতো ব্যক্তিত্ব খুব কম। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে শুধু গতি বা ফর্ম নয়, অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস, ড্রেসিংরুমে প্রভাব এবং প্রতিপক্ষকে মানসিক চাপে রাখার ক্ষমতাও বড় বিষয়। সেই জায়গায় নেইমার এখনো ব্রাজিলের সবচেয়ে প্রভাবশালী নামগুলোর একটি।

 

আনচেলত্তি আগেই বলেছিলেন, নেইমারের প্রতিভা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই; তার দলে ফেরা নির্ভর করবে মূলত শারীরিক অবস্থার ওপর। বিশ্বকাপ দল ঘোষণার পরও তিনি সিদ্ধান্তকে আবেগের বদলে ফিটনেস ও সাম্প্রতিক প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়েছেন।

 

ব্রাজিলের আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনিয়ার উপস্থিতি দলকে বড় শক্তি দিয়েছে। দলে আছেন এন্দ্রিক, মাতেউস কুনিয়া, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি ও ইগর থিয়াগোর মতো ফরোয়ার্ডও। তবে রদ্রিগো ও এস্তেভাওয়ের অনুপস্থিতি আক্রমণভাগে একটি শূন্যতা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চোটের কারণে রদ্রিগো ও এস্তেভাও দলে নেই; এই বাস্তবতাও নেইমারের অন্তর্ভুক্তিকে সহজ করেছে।

 

এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি হতাশ হওয়ার কারণ থাকতে পারে জোয়াও পেদ্রোর। সাম্প্রতিক সময়ে ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করেও তিনি দলে জায়গা পাননি। টকস্পোর্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চেলসির এই ফরোয়ার্ড ভালো মৌসুম কাটালেও আনচেলত্তি শেষ পর্যন্ত নেইমার, ইগর থিয়াগো, এন্দ্রিক, মার্টিনেল্লি, কুনিয়া, ভিনিসিয়ুস ও রাফিনিয়াদের ওপর আস্থা রেখেছেন।

 

দল ঘোষণার অনুষ্ঠানেও নেইমারের নাম ঘিরে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে নেইমার এখন শুধু একজন খেলোয়াড় নন; তিনি এক প্রজন্মের আবেগ, প্রত্যাশা ও অসমাপ্ত স্বপ্নের প্রতীক। ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপ জিততে না পারা ব্রাজিল আবারও ষষ্ঠ শিরোপার খোঁজে যাচ্ছে, আর সেই অভিযানে নেইমারের উপস্থিতি দলকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

 

তবে বাস্তবতা হলো, এটি ব্রাজিলের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাবান দল নয়। একসময় ফুলব্যাক পজিশনে যেখানে কাফু, রবার্তো কার্লোস, দানি আলভেস বা মার্সেলোদের মতো নাম ছিল, এখন সেখানে অভিজ্ঞ দানিলো, অ্যালেক্স সান্দ্রো ও ডগলাস সান্তোসদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। মিডফিল্ডেও কাসেমিরোর বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে আছে। ফাবিনিওর উপস্থিতি সেই অভিজ্ঞতার প্রয়োজনই তুলে ধরে।

 

এই দল বর্তমান ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের বাস্তব চিত্রও দেখাচ্ছে। স্থানীয় লিগের কয়েকজন ফুটবলার দলে জায়গা পেয়েছেন, যা দেশটির ক্লাব ফুটবলের আর্থিক শক্তি ও প্রতিযোগিতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। তবে একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট, ব্রাজিল এখন আর আগের মতো প্রতিটি পজিশনে বিশ্বসেরা বিকল্প তৈরি করতে পারছে না।

 

বিশ্বকাপে ব্রাজিলের গ্রুপপর্ব শুরু হবে ১৩ জুন মরক্কোর বিপক্ষে। এরপর তাদের প্রতিপক্ষ হাইতি ও স্কটল্যান্ড। আপাতদৃষ্টিতে গ্রুপটি ব্রাজিলের জন্য কঠিনতম নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অনিশ্চয়তা বিবেচনায় আনচেলত্তির দলকে দ্রুত ছন্দ খুঁজে পেতে হবে।

 

সব মিলিয়ে নেইমারকে দলে নেওয়া ব্রাজিলের জন্য একদিকে বড় আবেগের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে বড় ঝুঁকিও। তিনি যদি ফিট থাকেন এবং সীমিত সময়েও ম্যাচের মোড় ঘোরাতে পারেন, তাহলে আনচেলত্তির সিদ্ধান্ত প্রশংসিত হবে। কিন্তু যদি চোট, গতি বা ফর্মের ঘাটতি আবারও সামনে আসে, তাহলে এই নির্বাচন বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে।

 

নেইমারের বিশ্বকাপ অন্তর্ভুক্তি তাই শুধু একজন তারকার প্রত্যাবর্তন নয়; এটি ব্রাজিলের বর্তমান সংকট, নেতৃত্বের প্রয়োজন, প্রজন্ম বদলের চাপ এবং ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বড় ফুটবল গল্প।


সম্পর্কিত নিউজ