নাহিদের ৫ উইকেট, মিরপুরে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ

নাহিদের ৫ উইকেট, মিরপুরে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের টেস্ট লড়াই বরাবরই ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে বাড়তি আগ্রহের বিষয়। দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং আবেগ, প্রত্যাশা ও ইতিহাসের সমীকরণও জড়িয়ে থাকে প্রতিটি ম্যাচে। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চলমান প্রথম টেস্টেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পাঁচ দিনের জমজমাট লড়াই শেষে শেষ হাসি হেসেছে স্বাগতিক বাংলাদেশ। তরুণ পেসার নাহিদ রানার গতির ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে পাকিস্তান।

২৬৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চতুর্থ ইনিংসে কখনোই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি সফরকারীরা। শেষ পর্যন্ত ৫২.৫ ওভারে ১৬৩ রানে গুটিয়ে যায় পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংস। তাতে ১০৪ রানের দাপুটে জয় নিয়ে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল নাজমুল হোসেন শান্তর দল।

 

মিরপুরের উইকেটে চতুর্থ ইনিংসে ২০৯ রানের বেশি তাড়া করে জয়ের কোনো রেকর্ড নেই। সেই কঠিন বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ব্যাট করতে নামে পাকিস্তান। শুরু থেকেই বাংলাদেশি বোলাররা আঁটসাঁট বোলিংয়ে চাপে রাখেন সফরকারীদের। বিশেষ করে নাহিদ রানার আগ্রাসী পেস আক্রমণে বারবার বিপদে পড়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ।

 

দিনের শুরুতেই বল হাতে আঘাত হানেন তাসকিন আহমেদ। প্রথম ওভারেই ওপেনার ইমাম উল হককে (২) গ্লাভসবন্দি করে বাংলাদেশকে দুর্দান্ত সূচনা এনে দেন তিনি। এরপর অবশ্য আব্দুল্লাহ ফজল ও আজান আওয়াইজ কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দ্বিতীয় উইকেটে ৫৪ রানের জুটি গড়ে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছিল পাকিস্তান। তবে মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণিতে ১৫ রান করে বোল্ড হন আওয়াইজ। এরপর দ্রুতই আরেকটি ধাক্কা দেয় বাংলাদেশ। নাহিদ রানার অতিরিক্ত গতির সামনে দাঁড়াতেই পারেননি শান মাসুদ। উইকেটরক্ষক লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দিয়ে মাত্র ২ রানে ফেরেন পাকিস্তান অধিনায়ক।

 

চা বিরতির আগে ও পরে আব্দুল্লাহ ফজল ও সালমান আগা আবারও লড়াইয়ের চেষ্টা করেন। দুজনে মিলে ৫১ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন। ফজল ধৈর্যের সঙ্গে ব্যাটিং করে তুলে নেন ব্যক্তিগত ফিফটি। তবে তৃতীয় সেশনের শুরুতেই তাইজুল ইসলামের ঘূর্ণিতে এলবিডাব্লিউ হয়ে ৬৬ রানে থেমে যায় তার ইনিংস। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি তিনি।

 

ফজলের বিদায়ের পর দ্রুতই সালমান আগাকেও ফিরিয়ে দেন তাসকিন আহমেদ। স্লিপে দুর্দান্ত ক্যাচে ২৬ রানে আউট হন সালমান। এরপর পাকিস্তানের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সৌদ শাকিল। সপ্তম উইকেটে ৩১ রানের জুটি গড়ে ম্যাচে কিছুটা আশা জাগিয়েছিলেন তারা।

 

কিন্তু ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন নাহিদ রানা। প্রথমে সৌদ শাকিলকে (১৫) উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন তিনি। পরের ওভারেই ভয়ংকর এক সুইং ডেলিভারিতে বোল্ড করেন মোহাম্মদ রিজওয়ানকে (১৫)। তার এই ডাবল স্ট্রাইকেই কার্যত ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে পাকিস্তান।

 

এরপর লেজের ব্যাটারদের গুটিয়ে ফেলতে খুব বেশি সময় নেয়নি বাংলাদেশ। তাইজুল ইসলামের বলে এলবিডাব্লিউ হন হাসান আলী (১)। পরে নাহিদ রানার বলে নোমান আলীও ফেরেন। শেষ পর্যন্ত শাহীন শাহ আফ্রিদিকে শূন্য রানে আউট করে নিজের পঞ্চম উইকেট পূর্ণ করেন নাহিদ। টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি তার দ্বিতীয় পাঁচ উইকেট শিকারের কীর্তি।

 

দ্বিতীয় ইনিংসে নাহিদ রানা একাই নেন ৫ উইকেট। এছাড়া তাসকিন আহমেদ ও তাইজুল ইসলাম দুটি করে উইকেট শিকার করেন। একটি উইকেট পান মেহেদী হাসান মিরাজ। এর আগে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ২৪০ রান তুলে ৯ উইকেটে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। ফলে পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৬৮ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট হাতে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ১৫০ বলে ৮৭ রানের দারুণ ইনিংস খেলেন তিনি। তার ইনিংসে ছিল ৭টি চার।

 

মুমিনুল হক করেন ৫৬ রান। এছাড়া মুশফিকুর রহিম ২২, লিটন দাস ১১ এবং মিরাজ ২৪ রান করেন। শেষ দিকে দ্রুত রান তুলতে গিয়ে এক ওভারে মিরাজ ও তাইজুলকে ফিরিয়ে দেন নোমান আলী। পরে তাসকিন আউট হলে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ।

 

প্রথম ইনিংসেও বাংলাদেশ দারুণ ব্যাটিং করেছিল। শান্তর ১০১, মুমিনুলের ৯১ ও মুশফিকের ৭১ রানে ভর করে ৪১৩ রান তোলে স্বাগতিকরা। জবাবে পাকিস্তান প্রথম ইনিংসে ৩৮৬ রানে অলআউট হয়। আজান আলি ১০৩, আব্দুল্লাহ ফজল ৬০, রিজওয়ান ৫৯ ও সালমান আগা ৫৮ রান করেন।

 

প্রথম ইনিংসে ২৭ রানের লিড নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট ও বল-দুই বিভাগেই আধিপত্য দেখিয়ে জয় নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে তরুণ পেসার নাহিদ রানার আগ্রাসী বোলিং এবং অধিনায়ক শান্তর নেতৃত্ব এই জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।

 

প্রথম টেস্টের সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ১১৭.১ ওভারে ৪১৩/১০
(শান্ত ১০১, মুমিনুল ৯১, মুশফিক ৭১; নাহিদ ৪*, তাসকিন ২৮)

পাকিস্তান প্রথম ইনিংস: ১০০.৩ ওভারে ৩৮৬/১০
(আজান ১০৩, ফজল ৬০, রিজওয়ান ৫৯, সালমান ৫৮)

বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: ৭০.৩ ওভারে ২৪০/৯ ডিক্লেয়ার
(শান্ত ৮৭, মুমিনুল ৫৬, মিরাজ ২৪)

পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংস: ৫২.৫ ওভারে ১৬৩/১০
(ফজল ৬৬, সালমান ২৬; নাহিদ রানা ৫ উইকেট)

ফল: বাংলাদেশ ১০৪ রানে জয়ী, সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে।


সম্পর্কিত নিউজ