{{ news.section.title }}
বাংলাদেশে আদর্শ ছাত্ররাজনীতি যেমন হওয়া উচিত
বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি হওয়া উচিত শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক, জবাবদিহিমূলক, সহিংসতামুক্ত ও স্বচ্ছ নেতৃত্বভিত্তিক। রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি নয়, বরং শিক্ষার্থীদের অধিকার, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা, শিক্ষার মান, গবেষণা, আবাসন, পরিবহন, চিকিৎসা, লাইব্রেরি ও কর্মসংস্থান—এসব বাস্তব সমস্যা সমাধানই ছাত্ররাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনে ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে অনেক ক্ষেত্রে ছাত্ররাজনীতি তার আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে দলীয় লেজুড়বৃত্তি, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব, ফাও খাওয়া, র্যাগিং, সহিংসতা ও ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ছাত্ররাজনীতিকে ভয়, বিরক্তি ও অনাস্থার চোখে দেখে।
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতিকে নতুনভাবে ভাবতে হবে।
প্রথমত, ছাত্ররাজনীতি হতে হবে রাজনৈতিক দলের অন্ধ আনুগত্যমুক্ত। ছাত্রসংগঠন কোনো দলের ক্যাম্পাস শাখা হয়ে থাকবে না; বরং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। জাতীয় রাজনীতি সম্পর্কে মতামত থাকতে পারে, আদর্শ থাকতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন, ক্যাম্পাসের বাস্তবতা ও গণতান্ত্রিক আলোচনার ভিত্তিতে।
দ্বিতীয়ত, ছাত্ররাজনীতি হতে হবে দুর্নীতিমুক্ত ও চাঁদাবাজিমুক্ত। কোনো ছাত্রনেতা বা সংগঠন ক্যাম্পাসের দোকান, হল, পরিবহন, নির্মাণকাজ, ভর্তি, সিট বাণিজ্য, চাকরি বা টেন্ডার থেকে অবৈধ সুবিধা নিতে পারবে না। ছাত্রনেতার পরিচয় হবে সেবক হিসেবে, সুবিধাভোগী হিসেবে নয়। যেকোনো ধরনের চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, দখলদারিত্ব বা ফাও খাওয়ার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত শূন্য সহনশীলতা থাকা দরকার।
তৃতীয়ত, ছাত্ররাজনীতি হতে হবে র্যাগিং ও নির্যাতনমুক্ত। কোনো নতুন শিক্ষার্থীকে অপমান, ভয় দেখানো, মানসিক চাপ দেওয়া বা শারীরিক নির্যাতন করার কোনো অধিকার কারও নেই। সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক হবে সম্মান, সহযোগিতা ও পরামর্শের ভিত্তিতে। ক্যাম্পাসে ভয়ের সংস্কৃতি নয়, নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই ছাত্রসংগঠনগুলোর দায়িত্ব হওয়া উচিত।
ছাত্ররাজনীতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন ছাত্রনেতারা শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের পাশাপাশি তাদের পড়াশোনা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও ক্যারিয়ার গঠনে বাস্তব ভূমিকা রাখবেন।
চতুর্থত, নেতৃত্ব হতে হবে স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক। ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচন হতে হবে নিয়মিত কাউন্সিল, ভোট বা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বছরের পর বছর একই ব্যক্তি নেতৃত্বে থাকবে, অথচ পড়াশোনা শেষ করে ফেলেছে—এ ধরনের “আদুভাই” সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্ব অবশ্যই নিয়মিত ছাত্রদের হাতে থাকতে হবে। বয়স, ছাত্রত্ব, একাডেমিক অবস্থান ও আচরণবিধি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
পঞ্চমত, ছাত্ররাজনীতির মূল এজেন্ডা হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কল্যাণ। যেমন: আবাসন সংকট দূর করা, হলের খাবারের মান উন্নয়ন, পরিবহন সুবিধা বাড়ানো, লাইব্রেরি ও ল্যাব সুবিধা উন্নত করা, শিক্ষার ব্যয় কমানো, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সুযোগ বাড়ানো, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার উন্নয়নে কাজ করা।
ষষ্ঠত, ছাত্ররাজনীতি হতে হবে সহিংসতামুক্ত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবান্ধব। ভিন্নমত মানেই শত্রু নয়। ক্যাম্পাসে বিতর্ক, আলোচনা, সেমিনার, গবেষণা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও নীতিগত মতবিনিময়ের পরিবেশ থাকতে হবে। লাঠি, মিছিলের ভয়, হল দখল বা রাজনৈতিক পরিচয়ে আধিপত্য নয়; যুক্তি, নীতি ও কাজের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে হবে।
সপ্তমত, ছাত্রসংগঠনের অর্থায়ন হতে হবে স্বচ্ছ। সংগঠনের আয়-ব্যয় প্রকাশ্য থাকতে হবে। কে টাকা দিচ্ছে, কী কাজে খরচ হচ্ছে—এসব বিষয়ে সদস্যদের জানার অধিকার থাকতে হবে। গোপন অর্থায়ন, অবৈধ সুবিধা বা ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে ছাত্ররাজনীতির সম্পর্ক থাকলে তা শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সবশেষে, বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি হওয়া উচিত এমন এক রাজনৈতিক চর্চা, যেখানে ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব বড়; ব্যক্তিপূজা নয়, নীতি বড়; দখল নয়, সেবা বড়; দলীয় আনুগত্য নয়, শিক্ষার্থীদের অধিকার বড়। ছাত্ররাজনীতি যদি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের হাতিয়ার হয়, তাহলে তা দেশের গণতন্ত্রকেও শক্তিশালী করবে।