নির্মূলের মৌসুমে বাংলাদেশ: সালমান আহমদ জামি

নির্মূলের মৌসুমে বাংলাদেশ: সালমান আহমদ জামি
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত মৌসুম শুরু হয়েছে। যারা একদিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ক্ষমতার পথ হেঁটেছিল, আজ তারাই একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার ঘোষণা দিচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার কথা বলেছেন।

অন্যদিকে জামায়াতের আমির পাল্টা অভিযোগ এনেছেন - জুলাই সনদের প্রশ্নে বিএনপি জনগণের সঙ্গে সুস্পষ্ট প্রতারণা করছে। দুই পুরনো মিত্র আজ মুখোমুখি - এই দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন নয়, তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।


ইতিহাস একটু পেছনে ফিরলেই দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক পুনর্জন্ম হয়েছিল জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই। স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ এই দলটি জিয়ার আমলে আবার বৈধতা পায়, 'আইডিএল' নামে কার্যক্রম শুরু করে এবং ধীরে ধীরে মূলধারার রাজনীতিতে জায়গা করে নেয়। ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে চারদলীয় জোট গঠন করে ক্ষমতার স্বাদও পায়। সেই সময় দুই দলের নেতারা একই মঞ্চে বক্তৃতা দিয়েছেন, একই গাড়িতে চড়েছেন। তখন কেউ কারও '৭১-এর ভূমিকা' নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি।


কিন্তু রাজনীতির হাওয়া বদলায়। ২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচার শুরু হয়। একের পর এক ফাঁসির রায় কার্যকর হয়। গোলাম আজম, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মতো নেতারা কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেন। সেই দীর্ঘ দমন-পীড়নের কালে বিএনপি ও জামায়াত আবারও কাছাকাছি ছিল - একই নিপীড়নের শিকার হিসেবে। অথচ আজ সেই বিএনপিই জামায়াতের '৭১-এর ভূমিকা' স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের ডাক দিচ্ছে।


আরও তীক্ষ্ণ বিষয় হলো, যিনি জামায়াতকে নির্মূলের কথা বলছেন, তাঁর নিজের পিতার বিরুদ্ধেও '৭১-এর ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। রাজনীতিতে এই দ্বিচারিতার কোনো শেষ নেই। এই দ্বিচারিতা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরনো ব্যাধি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখানে আদর্শ নয়, হাতিয়ার। প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়, প্রয়োজন শেষে তুলে রাখা হয়। দলগুলো জোট বাঁধে ক্ষমতার হিসেবে, ভাঙে সুবিধার হিসেবে - নীতির প্রশ্ন সেখানে গৌণ।


তবে এবার পরিস্থিতি সত্যিই ভিন্ন। জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করে দিয়েছে, এই দেশের তরুণ প্রজন্ম পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তে আর আস্থা রাখতে রাজি নয়। তারা দলীয় পরিচয়ের চেয়ে জবাবদিহিতা চায়, জোটের অঙ্কের চেয়ে মূল্যবোধ চায়। বিএনপি-জামায়াতের এই পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি তাদের কাছে পুরনো নাটকের নতুন মঞ্চায়ন মাত্র।


রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে - তরুণ প্রজন্মের পালস এখন আর ভোটের মাঠে নয়, রাজপথে প্রমাণিত হয়েছে। যে দল এই বাস্তবতা বুঝে নিজেকে বদলাতে পারবে, ভবিষ্যৎ তার। আর যারা পুরনো খেলায় মেতে থাকবে, নির্মূলের মৌসুমে তারাই একদিন নিজেরা নির্মূল হয়ে যাবে।


সম্পর্কিত নিউজ