{{ news.section.title }}
কেন অবিবাহিতদের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি? জেনে নিন
বিয়ে সরাসরি ক্যানসার প্রতিরোধ করে না। তবে মানুষের সামাজিক জীবন, পারিবারিক সহায়তা, জীবনযাপন, অর্থনৈতিক স্থিতি ও নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণের অভ্যাস ক্যানসারের ঝুঁকিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মায়ামি মিলার স্কুল অব মেডিসিনের সিলভেস্টার কমপ্রিহেনসিভ ক্যানসার সেন্টারের নতুন গবেষণায় এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কখনো বিয়ে করেননি, তাদের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার বিবাহিত বা আগে কখনো বিবাহিত ছিলেন-এমন ব্যক্তিদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গবেষণাটি ২০২৬ সালের এপ্রিলে Cancer Research Communications জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকরা ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি অঙ্গরাজ্যের ৩০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ক্যানসার-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এতে ১০ কোটির বেশি মানুষের জনসংখ্যাগত তথ্য এবং ৪০ লাখের বেশি ক্যানসার রোগীর তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। গবেষণার ফল বলছে, যারা কখনো বিয়ে করেননি, তাদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় সব প্রধান ক্যানসার ধরনের ক্ষেত্রেই বেশি দেখা গেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, বিবাহিত বা আগে বিবাহিত ছিলেন-এমন পুরুষদের তুলনায় কখনো বিয়ে না করা পুরুষদের ক্যানসারের হার ৬৮ শতাংশ বেশি। নারীদের ক্ষেত্রে পার্থক্য আরও বেশি; কখনো বিয়ে না করা নারীদের ক্যানসারের হার বিবাহিত বা আগে বিবাহিত নারীদের তুলনায় ৮৩ শতাংশ বেশি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই হারকে আনুমানিক ৭০ শতাংশ ও ৮৫ শতাংশ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
কোন ক্যানসারে ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে
গবেষণায় বিশেষভাবে দেখা গেছে, প্রতিরোধযোগ্য বা জীবনযাপন-সম্পর্কিত ক্যানসারের ক্ষেত্রে অবিবাহিতদের ঝুঁকি বেশি। এর মধ্যে ধূমপান, অ্যালকোহল, সংক্রমণ এবং যৌনবাহিত ভাইরাসের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্যানসার বেশি উল্লেখযোগ্য। উদাহরণ হিসেবে, অবিবাহিত পুরুষদের মধ্যে মলদ্বারের ক্যানসারের হার বিবাহিতদের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি এবং অবিবাহিত নারীদের মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যানসারের হার প্রায় তিন গুণ বেশি দেখা গেছে। মলদ্বার ও জরায়ুমুখের ক্যানসারের সঙ্গে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা HPV সংক্রমণের সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষকরা আরও দেখেছেন, সংক্রমণ-সংশ্লিষ্ট ক্যানসার, ধূমপান ও অ্যালকোহল-সম্পর্কিত ক্যানসার এবং নারীদের ক্ষেত্রে প্রজনন-সম্পর্কিত কিছু ক্যানসারে বৈবাহিক অবস্থার সঙ্গে পার্থক্য বেশি স্পষ্ট। তবে স্তন, থাইরয়েড ও প্রোস্টেটের মতো যেসব ক্যানসারের জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিং ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, সেসব ক্ষেত্রে সম্পর্ক তুলনামূলক দুর্বল ছিল।
বিয়ে কি ক্যানসার থেকে রক্ষা করে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণার মানে এই নয় যে বিয়ে করলেই ক্যানসার হবে না, বা অবিবাহিত হলেই ক্যানসার হবে। এটি একটি সম্পর্ক বা association দেখিয়েছে, সরাসরি কারণ-ফল প্রমাণ করেনি। অর্থাৎ বিয়ে নিজে ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ নয়; বরং বিয়ের সঙ্গে যুক্ত কিছু সামাজিক ও আচরণগত বিষয় স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে পারে।
গবেষণার সহলেখক পাওলো পিনেইরো বলেন, বৈবাহিক অবস্থার মতো সামাজিক বিষয় জনসংখ্যা পর্যায়ে ক্যানসারের ঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে। অর্থাৎ একজন মানুষ একা থাকেন কি না, তার পাশে নিয়মিত সহায়তাকারী কেউ আছেন কি না, তিনি নিয়মিত চিকিৎসা নেন কি না-এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
পারিবারিক সহায়তা কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিবাহিত মানুষের ক্ষেত্রে সাধারণত একজন সঙ্গী বা পরিবার থাকে, যারা অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যেতে উৎসাহ দেন। অনেক সময় স্বামী বা স্ত্রী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধ খাওয়া, ফলোআপ ভিজিট, খাদ্যাভ্যাস ও ধূমপান ছাড়ার মতো বিষয়ে চাপ দেন বা সহযোগিতা করেন। এই ছোট ছোট দৈনন্দিন সহায়তাকে বিশেষজ্ঞরা “microinterventions” হিসেবে দেখছেন, যা দীর্ঘ সময়ে বড় স্বাস্থ্যগত পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
বিবাহিত ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকেন, স্বাস্থ্যবীমা বা চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বেশি থাকে এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে। এসব কারণে ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়তে পারে এবং চিকিৎসা মেনে চলার হার বাড়তে পারে।
অবিবাহিতদের ঝুঁকি কেন বেশি হতে পারে
গবেষকরা কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ দেখিয়েছেন। অবিবাহিত ব্যক্তিদের মধ্যে সামাজিক একাকিত্ব, অনিয়মিত জীবনযাপন, ধূমপান, অ্যালকোহল গ্রহণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করার প্রবণতা বেশি হতে পারে। এসব আচরণ অনেক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
তবে বিষয়টি একরৈখিক নয়। অনেক অবিবাহিত মানুষের শক্তিশালী পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী বা সামাজিক নেটওয়ার্ক থাকে। আবার সব বিবাহিত সম্পর্কও স্বাস্থ্যকর বা সহায়ক হয় না। তাই গবেষকরা বিয়েকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখছেন না; বরং সামাজিক সহায়তা, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও জীবনযাপনের মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি কেন দেখা গেল
গবেষণায় নারীদের ক্ষেত্রে বৈবাহিক অবস্থার সঙ্গে ক্যানসার ঝুঁকির পার্থক্য পুরুষদের চেয়ে বেশি দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে প্রজনন ইতিহাস, সন্তান জন্মদান, জরায়ুমুখ ক্যানসার স্ক্রিনিং, HPV সংক্রমণ, যৌনস্বাস্থ্য সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহারের পার্থক্য ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সন্তান জন্মদান জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত; বিবাহিত নারীদের মধ্যে মাতৃত্বের হার পরিসংখ্যানগতভাবে বেশি হতে পারে।
তবে এই ব্যাখ্যা সব নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। গবেষকরা বলেছেন, সামাজিক অবস্থান শরীরের কোষগত বা জীববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বয়স ও জাতিগত পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ
গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে বৈবাহিক অবস্থার পার্থক্য আরও স্পষ্ট হতে পারে। ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই সম্পর্ক বেশি শক্তিশালী দেখা গেছে, যা ইঙ্গিত করে দীর্ঘ সময়ের সামাজিক ও আচরণগত পার্থক্য জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে জমা হতে পারে।
গবেষণায় জাতিগত পার্থক্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কখনো বিয়ে না করা কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের মধ্যে সামগ্রিক ক্যানসারের হার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এতে বোঝা যায়, বৈবাহিক অবস্থার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য, আয়, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার ও জীবনযাত্রার পরিবেশও ক্যানসার ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা
এই গবেষণা বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হলেও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। প্রথমত, গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি অঙ্গরাজ্যের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হয়েছে, তাই ফলাফল সরাসরি বাংলাদেশসহ সব দেশের মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য বলা যাবে না। দ্বিতীয়ত, “কখনো বিয়ে করেননি” শ্রেণির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সঙ্গী নিয়ে থাকা মানুষও থাকতে পারেন, যাদের সামাজিক সহায়তা বিবাহিতদের মতোই হতে পারে। তৃতীয়ত, গবেষণায় ধূমপান, খাদ্যাভ্যাস, যৌন আচরণ, আয়, স্বাস্থ্যবীমা ও সামাজিক নেটওয়ার্কের সব তথ্য সমানভাবে ধরা সম্ভব হয়নি।
তাই ফলাফলকে সতর্কভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। এটি বিয়ের পক্ষে সামাজিক প্রচারণা নয়; বরং একাকিত্ব, সামাজিক সহায়তার অভাব ও স্বাস্থ্যসচেতনতার ঘাটতি ক্যানসার প্রতিরোধে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তা মনে করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশি পাঠকের জন্য বার্তা
বাংলাদেশে অনেকেই চিকিৎসকের কাছে যান দেরিতে, বিশেষ করে ক্যানসারের ক্ষেত্রে। লজ্জা, ভয়, অর্থনৈতিক চাপ, চিকিৎসা সুবিধার অভাব, পারিবারিক উদাসীনতা বা অসচেতনতার কারণে রোগ অনেক সময় দেরিতে ধরা পড়ে। এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো-বিয়ে নয়, সহযোগিতা ও সচেতনতা জীবন বাঁচাতে পারে।
যারা একা থাকেন, অবিবাহিত, বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত বা পরিবার থেকে দূরে থাকেন, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শরীরের অস্বাভাবিক লক্ষণ গুরুত্ব দিয়ে দেখা, ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়ানো, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টিকর খাবার, শারীরিক ব্যায়াম এবং প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিংয়ের বিষয়ে বেশি সচেতন হওয়া উচিত।
কী করবেন
দীর্ঘদিনের কাশি, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, শরীরে অস্বাভাবিক গাঁট, মল-মূত্রের অভ্যাসে পরিবর্তন, অস্বাভাবিক রক্তপাত, দীর্ঘস্থায়ী পেটব্যথা, খাবার গিলতে সমস্যা, মুখে বা ত্বকে না শুকানো ঘা-এসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়। এমন লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
নারীদের ক্ষেত্রে জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে HPV টিকা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং প্রজননস্বাস্থ্য সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষদের ক্ষেত্রেও ধূমপান, অ্যালকোহল, অনিরাপদ যৌন আচরণ ও স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ জরুরি। গবেষণায় যেহেতু প্রতিরোধযোগ্য ক্যানসারের ক্ষেত্রে পার্থক্য বেশি দেখা গেছে, তাই জীবনযাপন পরিবর্তনই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বার্তা।
মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বড় গবেষণা দেখাচ্ছে, বৈবাহিক অবস্থা ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কখনো বিয়ে না করা নারী-পুরুষের মধ্যে ক্যানসারের হার বেশি দেখা গেছে, বিশেষ করে প্রতিরোধযোগ্য ক্যানসারের ক্ষেত্রে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিয়ে ক্যানসারের ওষুধ। বরং মূল বিষয় হলো-সামাজিক সহায়তা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত পরীক্ষা এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার অভ্যাস।
যারা অবিবাহিত বা একা থাকেন, তাদের জন্য বার্তাটি ভয় পাওয়ার নয়; বরং আরও সচেতন হওয়ার। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী বা সামাজিক নেটওয়ার্কের সহায়তা নিয়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখলে ক্যানসারসহ বহু দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
তথ্যসূত্র: ইউনিভার্সিটি অব মায়ামি মিলার স্কুল অব মেডিসিন